অথ ‘বিজেপি-ফ্যাসিবাদ-আদানি’ কথা

আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উঠে আসা এইসব অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে তত্ত্বতালাশ করেছেন সন্তোষ সেন। তাঁর নিবন্ধ 'অথ বিজেপি-ফ্যাসিবাদ-আদানি কথা' প্রকাশিত হয় নবান্ন পত্রিকার জুলাই, ২০২৩ সংখ্যায়।

Adani

সন্তোষ সেন

[হিন্ডেনবার্গ রিপোর্টের (জানুয়ারি, ২০২৩) পর আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়া অভিযোগ উঠে এল অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট এর তদন্তে। যা অতি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে প্রথম সারির দুই আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র The Guardian এবং Financial Times এর পাতায়। আদানি গোষ্ঠীর ব্যবসা নিয়ে এই রিপোর্টে আবারও অভিযোগ উঠেছে: এই গোষ্ঠীর টাকা ‘কর ফাঁকির স্বর্গরাজ্য’ মরিশাসে পাচার করা হয়েছে, যার পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার। পরে তা আবার ঘুরপথে আদানি সংস্থার শেয়ারেই লগ্নি করা হয়েছে। এইভাবেই যাদুকরের হাতের ছোঁয়ায় ২০১৩ -২০১৮ সালে ফুলেফেঁপে ওঠে আদানিদের শেয়ার দর। বাস্তব সত্য এই যে, ২০১৪ – র গোড়ায় এইসব আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রেক্ষিতে শেয়ার বাজার নিয়ামক সংস্থা সেবি বেশ কিছু তথ্যও পেয়েছিল। আর বাস্তব সত্য হলো: সেবির তৎকালীন প্রধান ইউ কে সিনহা এখন আদানিদের হাতে থাকা NDTV- র ডিরেক্টর এবং চেয়ারপার্সন। এদিকে রাহুল গান্ধী আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন –”এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়িয়ে গেছে। তারপরও তিনি কেন এই কেলেঙ্কারির তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছেন না”? কংগ্রেস নেতৃত্ব এই ঘটনাকে ভারতের সবথেকে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে তকমা দিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে –”কেন এই একজন ব্যক্তিই দেশের বিমানবন্দর থেকে জাহাজ বন্দর সহ যাবতীয় জাতীয় সম্পদ জলের দরে কিনে ফেলছেন”?

আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উঠে আসা এইসব অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে তত্ত্বতালাশ করেছেন সন্তোষ সেন। তাঁর নিবন্ধ ‘অথ বিজেপিফ্যাসিবাদআদানি কথাপ্রকাশিত হয় নবান্ন পত্রিকার জুলাই, ২০২৩ সংখ্যায়।

এই নিবন্ধটির বিষয় ও বক্তব্য এখনও সমান গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক। তাই নতুন করে উঠে আসা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টিকে সম্যকভাবে বুঝে নেওয়ার জন্য পরিপ্রশ্নের ওয়েব ম্যাগাজিনে নিবন্ধটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো — সম্পাদকমণ্ডলী ]

কথামুখ: ফ্যাসিবাদের প্রকৃত বা চিরায়ত সংজ্ঞা কী, আমাদের দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন চালু হয়েছে কিনা, বা চালু হয়ে থাকলে তা কি হিটলার মুসোলিনিদের সমগোত্রীয় – এইসব কূট প্রশ্নগুলোকে আপাতত মুলতুবি রাখা যাক। বরং এই নিবন্ধে আমরা খোঁজার চেষ্টা করব – কেন্দ্রের ও কিছু রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় (একক বা অন্য সহযোগী শক্তির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে) বর্তমান শাসক দলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলোর মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি কতটা স্পষ্ট হচ্ছে। সকলের কাছে এটা স্পষ্ট যে, আদানি-আম্বানির মতো ওদের পেয়ারের গুটিকয়েক বহুজাতিক কোম্পানিকে কোটি কোটি টাকা ট্যাক্স ছাড় দেওয়া ও লোন মুকুব করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক ও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে ফুলে পেঁপে ওঠা ওদের কাল্পনিক বা ফাটকা পুঁজিকে বাস্তবের জমিতে সমতুল করার জন্য বেসরকারিকরণের নামে মানুষের শ্রম ও ট্যাক্সের টাকায় তিল তিল করে গড়ে তোলা রেল, বীমা, বন্দরের মতো জাতীয় সম্পদ সুকৌশলে জলের দরে ওদের হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি জমি, জল, জঙ্গল, পাহাড় সহ পুরো প্রাকৃতিক সম্পদকেই অরক্ষিত করে ওদের লুটের পাকা বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সস্তায় ও সুলভে দেশের কৃষিজমি ওদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই নিয়ে আসা হয়েছিল কৃষি-আইন। এইসবই করা হচ্ছে শুধুমাত্র কিছু কর্পোরেটের ফুলেফেঁপে ওঠা পুঁজির নয়া নয়া বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করে ওদের মুনাফার গতিকে সদা সচল রাখার স্বার্থেই। তাতে দেশের মানুষের দুর্গতি বাড়ে বাড়ুক, পরিবেশ বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করে করুক – কুছ পরোয়া নেহি। এমনকি, এইসব নিয়ে সংসদে ও সমাজ জুড়ে প্রশ্ন উঠলে, বিক্ষোভ প্রতিবাদ সংগঠিত হলে সব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এই প্রশ্নগুলোকেই আমরা যুক্তি ও তথ্য সহকারে আলোচনায় আনব এক এক করে।

আদানির ফুলেফেঁপে ওঠা ও হঠাৎ পতনের নেপথ্যে:

প্রথমেই দেখা যাক আদানি ও আম্বানির সম্পদের গ্রাফ কিভাবে চড়ছিল। তথ্য বলছে – ২০১৪ সালে আদানি পরিচালিত গোষ্ঠীর সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭.১ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৭১০ কোটি ডলার। ভারতের ধনুকবেরদের তালিকায় এদের স্থান ছিল সাকুল্যে এগারো নম্বরে। কোন যাদুবলে এই কোম্পানির আয় ২০২২-এ এসে দাঁড়ায় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে? অর্থাৎ, এই আট বছরে আয় বেড়েছে ২১ গুণ, অঙ্কের ভাষায় এই বৃদ্ধির পরিমান ২,০০০ শতাংশেরও বেশি। এর হাত ধরে এগারো থেকে দেশের এক নম্বর ও বিশ্বের তিন নম্বর ধনকুবের হিসেবে পরিগণিত হয় আদানি এন্ড কোম্পানি। আদানি গ্রুপের চেয়ারপার্সন গৌতম আদানির রকেটের গতিতে সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর পেয়ারের আর এক ‘ক্রনি ক্যাপিটাললিস্ট’ মিস্টার মুকেশ আম্বানির সম্পদের বাড় বাড়ন্তটাও একটু দেখে নেওয়া যাক। অক্সফ্যামের দ্যা ইনইকুয়ালিটি ভাইরাস: ডাভোস ইন্ডিয়া সাপ্লিমেন্ট, ২০২১-এর রিপোর্ট – ভারতের প্রাক্তন ধনীশ্রেষ্ঠ মুকেশ আম্বানির সম্পদ অতিমারির কালে ৭২% বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, এই সময়ে আম্বানির সম্পত্তিতে প্রতি ঘন্টায় ৯০ কোটি টাকা যুক্ত হয়েছিল। ঘণ্টা প্রতি এই ৯০ কোটি টাকা আয় করতে হলে একজন অস্থায়ী শ্রমিককে ১০,০০০ বছর টানা শ্রম দিয়ে যেতে হবে। এটাই আর্থিক বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র। আদানি গ্রুপের কেচ্ছায় ফেরা যাক। এই বছরের ২৪ জানুয়ারি বহু আলোচিত ও আলোড়িত হিন্ডেনবার্গ রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই আদানিদের শেয়ারদর নামতে থাকে হুড়মুড় করে। পতন বেশ চমকপ্রদ। শেয়ারের মূল্য ৮৮ শতাংশ খুইয়ে আদানি গ্রুপ ১৪০,০০০ কোটি টাকা লোকসান করে। এইভাবে পাহাড়ের চূড়া থেকে ধূলায় মিশে যাওয়ার আসল কারণ কী? প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যাচ্ছে –ওদের দেখানো সম্পদের অধিকাংশটাই ছিল ভুয়ো বা কাল্পনিক, স্টক ম্যানুপুলেশন বা জালিয়াতির মধ্য দিয়ে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে নিয়ে আদানি গ্রুপ সম্পদের পাহাড়ে অবস্থান করছিল। জালিয়াতির কিছু নমুনা হাজির করা যাক। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য আর্থিক সংস্থা ‘মর্গান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল’এর রিপোর্ট (১১. ২. ২৩) থেকে জানা যাচ্ছে – আদানি গোষ্ঠী যে অনুপাতের শেয়ার (ফ্রি ফ্লোট শেয়ার) খোলাবাজারে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে কেনাবেচা হয় বলে দাবি করে, তার অনেকটাই ভুয়ো বা কাল্পনিক। আসলে এর একটা বড় অংশ গৌতম আদানির বড় ভাই বিনোদের বিভিন্ন ‘শেল কোম্পানি’র কাছে গচ্ছিত থাকত। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে – মরিশাসে বিনোদ আদানির এরকম ৩৮ টি ভুয়ো সংস্থা আছে, এরূপ আরও অনেক ভুয়ো কোম্পানি ছড়িয়ে আছে ‘ট্যাক্স হেভেন’ বা বাণিজ্যের মুক্তাঞ্চলে। কীভাবে কাজ করত এই ‘শেল’ কোম্পানিগুলো? এইসব শেল কোম্পানিগুলোই বেনামে বাজার থেকে অস্বাভাবিক বেশি দামে আদানি গ্রুপের শেয়ার কিনে নিত। ফলতঃ কৃত্রিমভাবে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে রাখত। যার ফলে শেয়ার পিছু প্রকৃত আয়ের সাথে আদানি গ্রুপের শেয়ারের বাড়তি দামের কোন সামঞ্জস্য ছিল না। আসল খেলাটা ওরা খেলতো এটাকে কাজে লাগিয়েই। ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো এই বর্ধিত মূল্যের শেয়ার বন্ধক রেখেই ব্যাঙ্ক ও বিভিন্ন সংস্থা বা কোম্পানি থেকে ঋণ সংগ্রহ করত আদানি গ্রুপের কর্তাব্যক্তিরা। ওদের আর একটি জালিয়াতের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। বাজারে নথিভুক্ত বা রেজিস্টার্ড কোম্পানিগুলো বেশকিছু আর্থিক সুবিধা পায়। এই সুযোগ সুবিধেও ওরা নিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে। আদানি গোষ্ঠীর মালিকানাধীন তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বিনোদ আদানির শেল কোম্পানির সঙ্গে প্রয়োজনমতো লেনদেনের মধ্য দিয়ে বিধিবদ্ধ আর্থিক শর্তগুলি বাস্তবত পালন না করেও পার পেয়ে গেছে। এবার দেখা যাক ওদের ঋণের বহর কেমন ছিল। ‘ইক্যুইটি মাস্টার’ নামে একটি বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সংস্থার মতে – ভারতের ১০ টি সর্ববৃহৎ ঋণগ্রাহক কোম্পানির মধ্যে চারটিই হল আদানি গোষ্ঠীর নানা নামের অন্তরালে। আদানি গ্রিন এনার্জি, আদানি ট্রান্সমিশন, আদানি পাওয়ার, আদানি এন্টারপ্রাইজেস: এই চারটি কোম্পানিই সব থেকে বেশি ঋণ নিয়েছে ব্যাংক থেকে। ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি আদানি গোষ্ঠী বাজারে বন্ড বিক্রি করেও ঋণের একটা বড় অংশ সংগ্রহ করত। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় যে, ব্যাংকের সুদের থেকেও বন্ডের ক্ষেত্রে সুদের হার কম থাকে। তাছাড়া ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেশ কিছু শর্ত মানতে হয়, বিশেষ করে কোম্পানির অন্দরমহলে উঁকি মারার অধিকার জন্মায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের।

সাম্প্রতিক তথ্য বলছে –দেশি বিদেশী ২৫ টি ব্যাংক মিলিয়ে ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে বহুজাতিক আদানি কোম্পানির ঋণের পরিমাণ ৩,০৬০ কোটি ডলার, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় ২.৩ লক্ষ কোটি টাকা। এরমধ্যে বন্ড বিক্রি করে ঋণ ৩৯%, আন্তর্জাতিক ব্যাংক থেকে ২৯%, পাবলিক সেক্টর এবং প্রাইভেট ব্যাংক মিলিয়ে ৩২%। অন্যদিকে ভারতীয় জীবন বীমা নিগম (এলআইসি) আদানি গোষ্ঠীর শেয়ারে ৩০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এস বি আই থেকে আদানি গোষ্ঠী ঋণ নিয়েছে ২৬০ কোটি ডলার (ইকোনমিক টাইমস: ২. ২. ২৩ ও ২৭. ৪. ২৩)। এক্ষেত্রে শেয়ারের বাড়তি ভ্যালু দেখানোর পাশাপাশি সরকারি মদত ও পৃষ্ঠপোষকতার একটা বিষয় তো আছেই। আর আদানি গ্রুপের বর্তমান আর্থিক দূরাবস্থা দেখে এসবিআই কর্তৃপক্ষ এই টাকা ব্যাংকের ঘরে ফেরত আসা নেহাতই অসম্ভব বলে মনে করেন। পাঠকের নিশ্চয় স্মরণে আছে এর আগে লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কারা যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। অথচ মাত্র কয়েক হাজার টাকার কৃষিঋণ শোধ করতে না পারায় অবসাদগ্রস্ত কৃষকরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB) ‘র তথ্য বলছে –কৃষিঋণ, ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া, ইত্যাদি কারণে শুধুমাত্র ২০২০ সালে আমাদের দেশের ১০,৬০০ জন কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। ‘Make in india’ র পিছনে চাপা পড়ে যাওয়া ভারতের এটাই প্রকৃত চিত্র।

আদানি গোষ্ঠীর সাম্রাজ্য বিস্তারে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা:

আগের আলোচনা থেকে যে বিষয়টা স্পষ্ট হলো – ফুলেফেঁপে ওঠা আদানি সাম্রাজ্যের ভিতরটা ছিল ফাঁপা। নানারকম ম্যানুপুলেশন, আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতি করে ওদের শেয়ারের মূল্যকে প্রকৃত দরের থেকে অনেক বাড়িয়ে রাখত। সেই বর্ধিত মূল্য দেখিয়েই লক্ষ কোটি ডলারের ঋণ সংগ্রহ করে এসেছে এতদিন। কিন্তু শুধু হাওয়ার উপর তো একটা আর্থিক বুনিয়াদ তৈরি হতে পারে না। তাই ওদের ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো কাল্পনিক বা ফাটকা পুঁজিকে বাস্তবের জমিতে মান্যতা দেওয়ার জন্য বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার সমস্ত ধরনের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। মনে রাখা দরকার যে, গৌতম আদানি বা মুকেশ আম্বানি কেউ বাস্তবত পুঁজিপতি ছিলেন না। গুজরাট থেকে উঠে আসা এই দুই ব্যবসায়ী গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এবং দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আশীর্বাদ, আস্কারা, প্রশ্রয় পেয়ে দেশজুড়ে তাদের সাম্রাজ্যের শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে, এই নিয়ে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ নেই। প্রথমেই দেখা যাক দেশের অভ্যন্তরে কোন কোন ক্ষেত্রে আদানিগোষ্ঠীর লম্বা হাত পৌঁছে গেছে।

সমুদ্র ও বিমানবন্দর, জাতীয় সড়ক নির্মাণ, রেলপথ ও স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণ: এইসব পরিকাঠামো খাতে বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই আদানির উত্থান। পরবর্তী ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কয়লা খনি ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকানা গেছে আদানি গোষ্ঠীর হাতে। শুধু তাই নয়, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অস্ত্র সরবরাহের জন্য প্রথম বেসরকারি সংস্থা হিসেবেও তাদের ছাড়পত্র মিলেছে। সীমান্ত পারের, বিশেষ করে পাকিস্তানের হামলা থেকে দেশকে বাঁচানোর কথা প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপির নেতানেত্রীর মুখ থেকে অহরহ শোনা যায়। অথচ সেই সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেই সর্বপ্রথম বেসরকারি সংস্থা হিসেবে আদানি গোষ্ঠীকে ১,০০০ কোটি টাকার বরাত দেয়া হলো। এখানেই প্রশ্ন জাগে: অভিজ্ঞ ও পেশাদার সরকারি সংস্থার কি অভাব পড়িল? ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার একটি বিশেষ রিপোর্ট (১৫.৩.২৩) থেকে জানা যাচ্ছে – আদানি গ্রুপের শেয়ারের মালিক প্রধান চারটি সংস্থার মধ্যে অন্যতম হলো, ‘Elara India Opportunities Fund (Elara IOF)। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী প্রশ্ন তুলেছেন –”ভারতের মিসাইল এবং রাডার বিভাগের উন্নতি সাধন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হল আদানি গ্রুপের একটি সংস্থা এবং ইলারা নামক সন্দেহজনক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সংস্থাকে। কে নিয়ন্ত্রন করেন এই ইলারা গ্রুপ? কৌশলগত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণের ভার অনভিজ্ঞ আদানি গ্রুপ ও এইরকম একটি অপরিচিত বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দিয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে আপোষ করা হচ্ছে কেন?” এই জটিল প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর আসেনি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে। তবে প্রযুক্তির উন্নতির কল্যাণে সারা পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। অন্তর্জাল ঘেঁটে বেশ চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এই ইলারা ক্যাপিটাল আসলে একটি venture capital fund, যারা নতুন কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য অর্থ সাহায্য করে। বেঙ্গালুরু-নির্ভর একটি বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থা (ADTPL) -এর সাথে গাঁটছড়া বেঁধে তারা ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো এবং DRDO -এর নানান কাজে অংশগ্রহণ করে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আদানি গ্রুপ এই ADTPL সংস্থাটিকে কিনে নেয় ২০১৯ সালে। রাহুল গান্ধীর আরও অভিযোগ –

“আদানি গোষ্ঠীর শেল কোম্পানির হিসেব বহির্ভূত প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা কোথা থেকে কীভাবে এলো? এই প্রশ্ন যাতে সংসদে রাখতে না পারি, সেইজন্যই আমাকে বহিষ্কার করা হলো” (www.thehindu.com :4.4.2023)।

আদানি গ্রুপের আর্থিক তছরুপ, অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাহুল গান্ধী ছাড়াও অন্যান্য কংগ্রেস নেতৃত্ব, বিজেপি বিরোধী প্রায় সবকটি রাজনৈতিক দল সংসদের ভিতরে এবং বাইরে এইসব অভিযোগের তীর বারবার প্রধানমন্ত্রীসহ কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে নিক্ষেপ করলেও এখনো পর্যন্ত তাঁরা কোনো সদুত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেননি। সারাদেশ তো বটেই, আন্তর্জাতিক পরিসরেও তোলপাড় করা এইসব অভিযোগ সংসদে এমনকি ‘জেপিসি’ তে আলোচনার বিষয়বস্তু করে তোলা হলো না। এর আগেও আদানিদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠেছে। ২০১৭ সালে ইপিডব্লিউ’র তৎকালীন সম্পাদক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা তাঁর দুটি নিবন্ধের মধ্য দিয়ে এইসব অভিযোগকে সামনে আনেন। এবং ঐ সময় পত্রিকা গোষ্ঠীর তরফে এই বিষয়ে তৎকালীন আইনমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী এবং স্বয়ং গৌতম আদানিকে চারটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠানো হয়। তখনও সরকার বা SEBI কোন ব্যবস্থা নেয়নি, বরং পরঞ্জয়কে এই বেয়াদপির খেসারত দিতে হয় ইপিডব্লিউ’ র সম্পাদক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে। তারপরও অভিযোগ থেমে থাকেনি। ২০২১-এর এপ্রিলে ‘দ্যা কেন’ পত্রিকায় আদানি গ্রুপের শেয়ারের মালিকানা বিন্যাস নিয়ে নানান অসঙ্গতি ও আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সংসদেও এই অভিযোগ উঠলে, সরকার বাহাদুর আজকের মত তখনও নীরব ছিলেন। এবং শেয়ার মার্কেটের রেজিস্টার্ড কোম্পানিগুলোর প্রকৃত ফ্রি ফ্লোট অনুপাত নিয়ে SEBI সাধারণভাবে তদন্ত শুরু করলেও তার রিপোর্ট কোনোদিন জনসমক্ষে আনা হয়নি। এই দীর্ঘ নীরবতা কিসের ইঙ্গিত বহন করে?

এখানে আমাদের বক্তব্য খুব স্পষ্ট। সংসদীয় গণতন্ত্রে পুঁজিপতি, শাসকশেনীর সাথে সাধারণ জনগণের সমানাধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কোনদিনই পরিলক্ষিত হয়নি

ঠিকই। কিন্তু সংসদীয় কাঠামোয় অন্তত দেশের সব পুঁজিপতিদের সমান সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে, এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। তাহলে কেবল দুই একজন পুঁজিপতির স্বার্থ রক্ষার জন্য গণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিসরগুলোকে ধ্বংস করা হচ্ছে কেন? আসলে এভাবেই ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য বুর্জোয়া গনতন্ত্রের মূলমন্ত্র

‘অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতা’ র তত্ত্বকে গুলি মেরে কতিপয় পেয়ারের কর্পোরেটের স্বার্থে সবরকমের সরকারি সমর্থন, সাহায্য নিয়ে দরাজ হস্তে এগিয়ে আসে স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি। তাই আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগকে গৌতম আদানি “ভারতীয় জাতীয়তার অপমান” বলে উল্লেখ করতে পারেন। লুটেরা বহুজাতিক কোম্পানি এবং তাদের সেবাদাস রাষ্ট্রের কাছে জাতীয়তাবাদ মানে সমগ্র দেশ নয়। ওদের জাতীয়তাবাদ দেশের আপামর জনসাধারণের আর্থিক সুযোগ-সুবিধে, চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের কথা বলে না। ওদের এই জাতীয়তাবাদের আসল মানে আদানি আম্বানির সাম্রাজ্য বিস্তার। এই যুক্তির স্বপক্ষে আমরা আরও কিছু বাস্তব তথ্য ও ঘটনাকে সামনে আনব।

বিরোধীদের সমস্ত আপত্তি উপেক্ষা করে আদানি গ্রুপের কর্ণধারকে ২০১৮ সালে দেশের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রক্ষণাবেক্ষণের ভার তুলে দেয়া হয়। যদিও বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আদানি সংস্থার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা কস্মিনকালও কেউ শোনেনি। বিমান ও সমুদ্র বন্দর, বিদ্যুৎ সরবরাহ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, এমনকি স্পর্শকাতর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রও চোখ বুজে আদানিদের হাতে দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হয়েছে কখনো প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ায় দরপত্র পরীক্ষা না করে, কখনো বা অন্য প্রতিযোগীদের ইডির মতো এজেন্সির ভয় দেখিয়ে প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করে। চুনোপুঁটি সব গিলে খেয়ে বোয়াল মাছের মতো ফ্যাসিবাদ এগিয়ে চলে এভাবেই। আদানিদের পেট মোটা করার বিস্তর উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তার মাত্র কয়েকটি তুলে দিচ্ছি পাঠকের দরবারে। গুজরাটের ‘কচ’ জেলায় ‘মুন্দ্রা পেট্রোকেম লিমিটেড’ এর ১০০% শেয়ার ২০২১ সালে আদানি এন্টারপ্রাইসেস লিমিটেডের হাতে তুলে দেয়া হলো, ওখানে ওরা নাকি কয়লা থেকে পিভিসি তৈরীর কারখানা করবে। যদিও হিন্ডেনবার্গ প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওদের সাম্রাজ্যের কোটি কোটি ডলার কর্পুরের মতো উবে যাওয়ায় ‘অ্যাপেল থেকে এয়ারপোর্ট’ সবকিছু নিয়ে ব্যবসা ও মুনাফার করার কারিগর আদানি বাবু বাধ্য হলেন এই পেট্রোকেমিক্যালের কাজ বন্ধ রাখতে (ইকোনমিক টাইমস: ৩০.৩.২৩)। বেলুন থেকে হাওয়া বেরিয়ে গেলে এভাবেই তো চুপসে যায়। সরকারি বদান্যতার আরেকটি ঘটনা –’জয়পুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ এর দেখভাল, ম্যানেজমেন্ট ও উন্নয়ন প্রকল্পের বরাত কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ৫০ বছরের জন্য আদানি গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়া হয় ২০২১-এর অক্টোবরে। মজার ব্যাপার হলো – ‘এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া’ রাজস্থান হাইকোর্টে এই সম্পদ হস্তান্তর শুল্কবিহীন কিনা জানতে চাইলে, মহামান্য আদালত জানান যে, আদানি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এই সম্পদ হস্তান্তর সম্পূর্ণ শুল্কবিহীন। এটাও জানা যায় যে, এর আগে গুজরাট ও উত্তরপ্রদেশেও এরূপ ঘটনা ঘটেছে (ইকোনমিক টাইমস: ২৪. ৩. ২৩)। এবার নিশ্চয়ই স্পষ্ট হচ্ছে যে, প্রবল পরাক্রম মহান দেশভক্ত আদানি মহাশয়ের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে গন্ডায়-গন্ডায় অভিযোগ জমা পড়লেও দেশের মসিহা কেন নীরব নিশ্চুপ হয়েই থেকে যান। জালিয়াতি করে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে তোলা আদানি গ্রুপের শেয়ারের দরকে বাস্তবের জমিতে রিয়েল করে তোলার সুযোগ দিতেই দেশের মানুষের শ্রম ও করের টাকায় তিল তিল করে গড়ে তোলা জনগণের সম্পদ: রেল, বীমা, বন্দর, কয়লা খনি, বিদ্যুৎ পরিবহন, সমস্ত কিছু ওদের হাতে তুলে দেওয়ার ফ্যাসিবাদী পথ ধরেই এগিয়ে চলেছে বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার। একই কারণে পছন্দের কিছু কর্পোরেটের হাতে দেশের সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদও নির্বিচারে তুলে দেয়া হচ্ছে এবং সমাজে তার কী প্রভাব পড়ছে, সেইদিকে এবার তাকানো যাক।

আদানি ও পরিবেশ বিপর্যয়:

ই আই এ (এনভায়রনমেন্টাল ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট) সমস্ত পরিবেশ আইন, যেখানে কোনো বড় প্রকল্প শুরুর আগে পরিবেশ দপ্তরের অনুমতি বা ছাড়পত্র লাগে, খোলনলচে পাল্টে এবং চালু-বনাধিকার আইন ২০০৬ এর পরিবর্তে বন সংরক্ষণ সংশোধনী আইন ২০২২-এর নতুন প্রস্তাবনা এনে কয়লা, লোহা, বক্সাইট খনি সহ পাহাড়, জঙ্গল, এমনকি সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যান, নদী-জলাশয় তথা দেশের পুরো প্রাকৃতিক সম্পদই আদানি, আম্বানি সহ আরও কিছু বহুজাতিক লুটেরা কোম্পানির হাতে তুলে দিতে বদ্ধপরিকর নরেন্দ্র মোদির সরকার। কর ছাড়, লোন মুকুব সহ নানান আর্থিক সুযোগ সুবিধে পেয়ে জলের দরে দেশের-দশের প্রাকৃতিক সম্পদ করায়ত্ত করে আদানি গ্রুপ আজ ভারতের সর্ববৃহৎ বেসরকারি কয়লা কোম্পানি। গুজরাট থেকে শুরু করে রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, উড়িষ্যা, অন্ধপ্রদেশ হয়ে দেশব্যাপী ৪৪ টি কয়লা প্রকল্পের জাল বিস্তার করে আদানি গ্রুপ কয়লা সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠেছে। ৪৪ টির মধ্যে অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ শেষ এবং বেশিরভাগ প্রকল্পই আদিবাসী অধ্যুষিত ঘন বনাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। বলাই বাহুল্য, প্রকল্পগুলি গড়ে উঠেছে জঙ্গল কেটে, বন্যপ্রাণ সহ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং আদিবাসী জনজাতি মানুষদের তাদের সমস্ত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে। উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া এই দরিদ্র প্রান্তিক মানুষগুলো পরিযায়ি শ্রমিকের দলে নাম লেখালে, বা গড়ে ওঠা ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিতে গাড়ির ড্রাইভার, খালাসি কিম্বা হোটেলে বাসন মাজার, বা পরিচারিকার দলে নাম লেখালে প্রধানমন্ত্রীর প্রাণ কাঁদে না। এটাই ধনকুবের ও তাদের রক্ষক রাষ্ট্রনায়কদের দেশপ্রেম। আদনিদের আর একটি কুকীর্তি সামনে আনা দরকার। এই মুহূর্তে ওদের মালিকানায় ভারতে রয়েছে ছয়টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, এই কেন্দ্রগুলোতে শুধুমাত্র এক বছরে (২০২২ সালে) মোট ৪০ কোটি মেগাটন কয়লা পোড়ানো হয়েছে, যার ফলে বাতাসে নতুন করে ৫৮ কোটি টন বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস মিশেছে (www.stopAdani.com)।

ভূউষ্ণায়ন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, বরফের গলন, কোথাও বা কম সময়ে অতিবৃষ্টি, বন্যা-প্লাবন, ঋতুচক্রের খামখেয়ালিপনা ও জলবায়ুর পরিবর্তন: সব মিলিয়ে পরিবেশ বিপর্যয় আজ এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেছে যে, মানব সভ্যতার অস্তিত্বই বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে। এই আবহে পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ যখন কয়লাখনি ও তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবর্তে নানান বিকল্প পথের কথা ভাবছে, ঠিক তখন ভারতবর্ষে একের পর এক নতুন কয়লাখনি ও তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের বরাত দেওয়া হচ্ছে, যার বেশিরভাগ আবার আদানি গোষ্ঠীর করায়ত্ত। বহু আলোচিত ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা জেলায় আদানি পাওয়ার লিমিটেডের তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও আমরা দেখলাম – ১২টি গ্রামের জনজাতিদের হটিয়ে, তাদের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত করে, ১২০০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ঝাড়খন্ড –পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ পৌঁছে যেতে শুরু করেছে। ওখানকার পরিবেশ বিপর্যয়ের সাথে সাথে এই রাজ্যে প্রচুর কৃষকের আম, লিচু বাগান ও কৃষিজমি ধ্বংস করে ওদের এই স্বপ্নের প্রকল্প চালু হলো। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, গোড্ডার এই প্রকল্পে প্রয়োজনীয় কয়লা আনার পরিকল্পনা রয়েছে আদানির অস্ট্রেলিয়ার কয়লাখনি (Carmichael coal mine) থেকে। আহা, কী সুন্দর ব্যবস্থা! অস্ট্রেলিয়ার ‘গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ’ ধ্বংস করে, সমুদ্রের জল দূষিত করে, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের সর্বনাশ করে, বাংলাদেশের উঠতি ভোগ্যপণ্যের বাজার দখল করার পাক্কা বন্দোবস্ত। এইভাবেই আদানির মুকুটে বিশ্বসেরার শিরোপা পরিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে ফ্যাসিস্ট বাহিনী।

আশার কথা এই, অস্ট্রেলিয়ার আদানিদের প্রকল্পে স্থানীয় জনজাতিদের উচ্ছেদ সহ পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে মানুষজন বিক্ষোভ প্রতিবাদে সংগঠিত হয়েছেন। তবে নতুন বনাঞ্চল আইন কার্যকরী করতে পারলে তো সোনায় সোহাগা! তখন আর হাজার হাজার বনবাসি মানুষকে জঙ্গল থেকে তাদের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে সমূলে উৎপাঠিত করতে আইনগত বাধাটুকুও থাকবে না, নাছোড় জনগন প্রতিবাদ করলে রাষ্ট্রশক্তি লেলিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত তো থাকবেই। দেশের দলিত, প্রান্তিক ও ভিন ধর্মের মানুষদের আরও কোণঠাসা করে উচ্চবর্ণের রাজ কায়েম করা এবং কর্পোরেট বাহিনীর মুনাফার অশ্বমেধ ঘোড়াকে ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়া: এগুলোই ফ্যাসিজমের পথ প্রস্তুত করে। গনতান্ত্রিক কাঠামো, সাংবিধানিক অধিকার, খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের মৌলিক অধিকার: এইগুলোকে সহ্য করতে পারে না ফ্যাসিস্ট শক্তি। কারণ, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবার আগে ওদের পথের কাঁটা এই আইন-কানুন গুলোকে নিজেদের মতো করে পাল্টে নিতে হয়। তাই আজ সকল জনগণের চিৎকার করে জানিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে: স্টপ-আদানি-স্টপ; স্টপ-মোদিজী-স্টপ।

আন্তর্জাতিক যোগসূত্র:

স্বভাবতই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় ফ্যাসিস্ট শক্তির অন্য দুই প্রতিনিধি আমেরিকা ও ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট যথাক্রমে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জইর বলসানারো’ র সাথে। এই দুই প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়কের পরিবেশ নীতি ও রাষ্ট্রশাসন নীতি নিয়ে এর মধ্যে প্রচুর আলোচনা হয়েছে এবং ওদের ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেওয়ার পিছনে অন্যান্য কারণের সাথে পরিবেশ-নীতিও একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শুধুমাত্র কর্পোরেট লবির পাহাড় প্রমাণ মুনাফার স্বার্থে পৃথিবীর ফুসফুস আমাজনের গভীর বৃষ্টি- অরণ্যকে কেটে, পুড়িয়ে জলাঞ্জলি দেওয়ার সাথে সাথে স্থানীয় জনজাতিদের জীবন জীবিকা বিপন্ন করার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে পয়লা নম্বর ‘পরিবেশ দুষ্কৃতি’ হিসেবে কুখ্যাত হয়ে আছেন ব্রাজিলের প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়ক। এইরূপ মহান রাষ্ট্রনায়ককেই ২০২০ সালে আমাদের দেশের প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি করে সাদরে বরণ করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক স্তরে ফ্যাসিবাদীদের যোগসূত্র গড়ে তোলার নীল নকশা বানানো চলে এভাবেই। অন্যদিকে ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তি’ লঙ্ঘন করে ট্রাম্প সাহেবও কুখ্যাত হয়ে থেকে গেলেন পরিবেশ বিজ্ঞানী এবং প্রকৃতি রক্ষা করার দাবিতে আন্দোলনরত কিশোর কিশোরী ও যুবা বাহিনীর চোখে। ক্ষমতার থেকে ছিটকে যাওয়ার পরও ট্রাম্পের ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি। ‘ক্যাপিটাল হিলস’ এ হামলার পিছনে ট্রাম্পের অবদান বিশ্ববাসী সকলেই জানেন। এখন আবার আমেরিকার হেজ-ফান্ড শক্তিকেন্দ্র গুলোকে কাজে লাগিয়ে, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের বিরুদ্ধে সাদা চামড়ার মানুষদের খেপিয়ে ফ্যাসিবাদী কায়দায় আমেরিকার ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে মশগুল ট্রাম্প এন্ড কোম্পানি। আমেরিকা ফ্যাসিবাদী পথে হাঁটলে তার নতুন উপনিবেশ হিসেবে ভারতবর্ষকে প্রজেক্ট করার জন্য আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিজেপি তথা সংঘবাহিনীকে সাথে নিয়ে এবং তাদের আশীর্বাদধন্য কর্পোরেটের একটা অংশের মদত পেয়ে আরএসএসের স্বপ্নের রামরাজ্য তথা হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার বাসনায় ঘুঁটি সাজিয়েই চলেছেন। সমাজ জুড়েই এই বিনির্মাণ কীভাবে চলছে?

সমাজ মানসে ফ্যাসিবাদের বিস্তার:

হিন্দু-মুসলিম বিভাজন, মুসলিম বিদ্বেষ, দলিত ও আদিবাসী জনজাতিদের বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণের অত্যাচার, নির্যাতনকে পাথেয় করার সাথে সাথে নাগরিকত্ব শনাক্তকরণের নামে ‘এনআরসি’ র মতো অযৌক্তিক, অমানবিক আইন সারাদেশে কার্যকর করার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে আরএসএস, বিজেপি বাহিন। আসামের অভিজ্ঞতা এটাই বলে যে, সারাদেশে এনআরসি লাগু করতে পারলে এক বড় অংশের মানুষকে বেনাগরিক ঘোষণা করে সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ডিটেনশন ক্যাম্পের অন্ধকার খুপরিতে ছুঁড়ে ফেলা যাবে। নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাওয়া এই জনগণের স্বভাবতই মৌলিক অধিকারটুকুও থাকবে না। তাঁদের জমিজমা, বসতবাড়ি সবই কেড়ে নেওয়া হবে এবং অধিকারবিহীন এই বেনাগরিক বাহিনী বাধ্য হবেন সস্তা শ্রমের মজুরি দাসে পরিণত হতে। দেশটাকে কর্পোরেটদের মৃগয়াক্ষেত্র বানাতে এর চেয়ে ভালো বন্দোবস্ত আর কী হতে পারে? স্বাভাবিকভাবেই গ্রামের গরীব প্রান্তিক মানুষজন সবচেয়ে বেশি করে এই দলে পড়বেন। তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও নানান সুযোগের অভাবে এমনিতেই তাঁদের অনেকেরই দলিল দস্তাবেজ, পরিচয়পত্র সহ সহ নানান কাগজপত্রের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। আর যতটুকু যা ছিল, তাও বন্যা ঝড়ঝঞ্ঝার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হয়ে যায় বারবার। কোথায় যাবেন এই মানুষগুলো?

একদিকে দেশের সম্পদ কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে রান্নার গ্যাস, জ্বালানি তেল, খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি-মুদ্রাস্ফীতি, শ্রমিকের কাজের সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি মজুরি হ্রাস, বেকারত্ব, ছাঁটাইয়ের কোপ নামিয়ে আনা হচ্ছে আপামর জনসাধারণের উপর। নিয়ে আসা হয়েছে শ্রমকোড, যাতে আইনি বাধা হটিয়ে অর্থনৈতিক শোষণের মাত্রাকে বাড়ানো যায়। এসবের হাত ধরে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বৈষম্যের চিত্রটা দেখুন। দেশের মোট সম্পদের প্রায় পুরোটাই (৭২.৫%) আদানিদের মতো মাত্র ১০ শতাংশের বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদে চলে গেছে। ফলস্বরূপ, ২০২২ সালে বিশ্বের ক্ষুধা সূচকের তালিকায় ১২১ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৭ নম্বরে, অর্থাৎ শেষের দিক থেকে প্রথম হওয়ার খুব কাছে। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি বড় শিল্প বা সংস্থায় কাজের সুযোগ তলানিতে ঠেকে যাওয়ার ফলে মূলত ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর সার্ভিস সেক্টরে ও মার্কেটিংয়ে এক বিশাল সংখ্যক কর্মী অত্যন্ত অল্প মজুরি বা কমিশনের ভিত্তিতে ১২-১৪ ঘণ্টার অমানবিক পরিশ্রমে পিঠে ব্যাগ বা গাড়িতে আরোহী নিয়ে জীবনের এক অমূল্য সময় কাটিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এই গিগ ওয়ার্কারদের সাপ্তাহিক ছুটি, পি এফ, পেনশন, গ্র্যাচুইটি: কোনো রকম সুবিধের কোনো বালাই নেই। হিন্দু, মুসলিম সহ সকলের জন্য কিন্তু একই নিয়ম। ভারতের মিলিটারি বাহিনীতে গ্রামের গরিব মানুষের স্থায়ী চাকরির একটা সুযোগ ছিল, সেটাকেও অগ্নিবীর প্রকল্পের মধ্য দিয়ে চার বছরের জন্য অস্থায়ী কাজে পরিণত করা হলো। আসলে, বিভাজনের বৈষম্যের এরকমই এক হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা চলছে।

এইসব চরম অর্থনৈতিক দূরাবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমিক মজুর কৃষক সহ খেটে খাওয়া মানুষ যাতে বিক্ষোভ প্রতিবাদে ফেটে না পড়েন, তার জন্য জাতি ধর্ম বর্ণের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ বিভাজন বাড়িয়ে সমাজ-বিচ্ছিন্ন একক মানুষে পরিণত করার সংস্কৃতি সমাজ জুড়েই চারিয়ে দেওয়া হয়েছে। “সব সমস্যার মূলে রয়েছে মুসলিম জনগণ”, “দেশের সমস্ত নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে কেবলমাত্র শত্রুদেশ পাকিস্তান” –এই মিথ্যার বীজ বপন চলছে অহরহ। মানুষকে ওদের এই পরিকল্পনার শরিক করে তুলতে অন্ধ দেশভক্তি, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্বের তাস খেলা চলছে। এইভাবেই মিথ্যা প্রচার ও ইতিহাস বিকৃতি করে ফ্যাসিস্ট বাহিনী তাদের সব কর্মকাণ্ডের স্বপক্ষে সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের সমর্থন জুটিয়ে নিয়ে শেষ বিচারে হিন্দু-মুসলমান-দলিত নির্বিশেষে খেটে খাওয়া গরীব মানুষের উপর অর্থনৈতিক শোষণের স্টিমরোলার চালিয়ে নিয়ে যেতে চায়। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদ শুধু নিপীড়ন করে না, নিপীড়নের স্বপক্ষে সামাজিক অনুমোদন জোগাড় করার চেষ্টাও করে প্রতিনিয়ত। তাই বহুভাষা, বহুজাতি, বহু ধর্ম ও সংস্কৃতি সমন্বিত ভারতবর্ষের বহুত্ববাদের মধ্যে একতার চিরকালীন ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত করে একজাতি, একদল, এক ভাষা, সর্বোপরি একমেম্বদ্বীতিয়ম নেতার নামে হিন্দি-হিন্দু হিন্দুয়ানার সংস্কৃতি সমাজ মননে প্রোথিত করার চেষ্টা চলছে। এভাবেই আরএসএস’ এর রামরাজ্য তথা হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নে মশগুল ওরা। পাশাপাশি বিচারবিভাগ সহ সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংবাদপত্র, মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সমস্ত গণতান্ত্রিক কাঠামো ফ্যাসিবাদী শক্তির কব্জায় অথবা সেগুলো নানাভাবে আক্রান্ত। অন্যদিকে ইতিহাস উল্টেপাল্টে দিয়ে, বৈজ্ঞানিক যুক্তি-তত্ত্বের পরিবর্তে, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট মানুষজনের মতামত, সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজেদের প্রয়োজন মতো পাঠ্যসূচি বদলে ফেলে আর এস এস’ র মনুবাদী ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও আদর্শকে ছাত্রছাত্রীদের সরল মনের সাদা পাতায় শিশুকাল থেকেই এঁকে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে।

প্রাচীন ভারতবর্ষের প্রকৃত যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার চর্চা না করে, ঐতিহ্যের নামে পুরাণের যুগে ফিরে গিয়ে অবিজ্ঞান, অপবিজ্ঞান, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কারের চাষ করা হচ্ছে। ভারতের অত্যন্ত বলিষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞান বা প্রকৃতি বিজ্ঞানের পাঠ ভুলিয়ে জ্যোতিষশাস্ত্রের মতো ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু’ র পিছনে মানুষকে যুতে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সমস্ত ঘটনার পিছনে কার্য-কারণ সম্পর্ক খোঁজার যুক্তিবাদী মন, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে দূরে সরিয়ে দিতে পারলেই তো ওদের সব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমর্থনে চোখে ঠুলি আঁটা একদল অন্ধভক্ত ও চাটুকারের দল তৈরি করা যাবে। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির ধ্বজাধারী এদের পূর্বসূরীরাও তো এইরকমই এক ‘দাস যুগ’ প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখতেন।

শুধু তাই নয়, সংবিধান প্রদত্ত নূন্যতম অধিকার হরণ করে এবং রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে সমস্ত প্রতিবাদী স্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। এই অহংকারী দাম্ভিক শক্তির অন্যতম হাতিয়ার নারী-বিদ্বেষ, নারী-নির্যাতন। দেশজুড়ে, বিশেষ করে ওদের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে নারীজাতির বিরুদ্ধে হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃনা ছড়ানোর খামতি নেই। নারী মানে –”দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, যাদের কাজ শুধু সন্তান উৎপাদন ও সংসার প্রতিপালন”। পতিব্রতা, গৃহকর্মে নিপুনা হিন্দুরমণীই আরএসএস, বিজেপির আদর্শ। তাই চূড়ান্ত নারী-বিদ্বেষী এই দল নারী-নির্যাতন এবং ধর্ষণে অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি তো করেই না, বরং ধর্ষকদের সমর্থনে ও তাদের মুক্তির দাবিতে পথে নেমেছে ফ্যাসিস্ট বাহিনীর কর্তাব্যক্তি ও সাঙ্গপাঙ্গরা। কাঠুয়া, উন্নাও, হাতরাস, সর্বত্রই এইসব ঘটেছে বারবার। এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি একই ঘটনার সাক্ষী থাকলো দেশবাসী। যৌন হেনস্থার অভিযোগে বিজেপি নেতা ব্রিজভূষণের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে অলিম্পিক বিজয়ী মহিলা কুস্তিগীররা দীর্ঘদিন ধরে দিল্লিতে জমায়েত-বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। কুস্তিগীরদের দাবির সমর্থনে সংযুক্ত কৃষাণ মোর্চা, ছাত্র ও নারী সংগঠনের কয়েক হাজার মানুষ সামিল হলেও এখনো পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নিশ্চুপ এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। মুখোশের আড়ালে এটাই ফ্যাসিবাদী শক্তির আসল মুখ।

উপসংহার এর বদলে:

স্পষ্ট করে বুঝে নিতে হবে – স্বৈরতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক, কমিউনিস্ট ও নারী বিদ্বেষী দলটি ফ্যাসিবাদী কায়দায় যতই আক্রমণ নামিয়ে আনুক না কেন, এদেরকেও পরাস্ত করা সম্ভব। ইতিহাস সেই কথাই প্রমাণ করেছে বারবার। আমাদের দেশে কৃষকদের এক বছর ধরে চলা ঐক্যবদ্ধ সংগঠিত লড়াইয়ের শক্তিও প্রমাণ করেছে — দাম্ভিক, অহংকারী শক্তিকেও টলিয়ে দেওয়া যায়। হিন্ডেনবার্গ রিপোর্টের এক খোঁচায় আদানি সাম্রাজ্যকে আপাতত হলেও পাহাড়ের চূড়া থেকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারলে, ওদের সেবাদাস বিজেপি ও সংঘবাহিনীকেও রুখে দেয়া সম্ভব। অন্যদিকে আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, বেকার বাহিনীর লম্বা লাইন, কাজের সময় বৃদ্ধি, ছাঁটাই, মজুরি হ্রাস: সবমিলিয়ে অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্যের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে এবং আগামী দিনে যা আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। স্বভাবতই শ্রমিক কৃষক ক্ষেতমজুর সহ সর্বস্তরের খেটে খাওয়া মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবেন, হতেই হবে এই তানাশাহীকে রুখে দিতে।

অন্যদিকে সমাজের মননে, মানুষের অন্তরে ঘৃনা -বিদ্বেষ-বিভাজনের যে বীজ ওরা বপন করেছে: তার বিপরীতে বিজ্ঞান, যুক্তি, সঠিক তথ্য সহকারে সবকিছু বিচার করা, প্রতিটি কাজের পিছনে নির্দিষ্ট কারণ খোঁজা ; সোহার্দ্য, সম্প্রীতি ও বিশ্বমানবতার বোধ প্রচার ও প্রসার করা এবং ঐতিহ্যের নামে পুরাণের গল্পকথায় ফিরে না গিয়ে সঠিক দিশায় সমাজ ও মানুষের প্রগতির বার্তা প্রচারের মধ্য দিয়ে ওদের মিথ্যার জালকে ছিন্ন করা সম্ভব। মননের জগতে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে বামপন্থী দল, অধিকার আন্দোলনে কর্মী, বিজ্ঞান ও পরিবেশ কর্মী, সংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথী সহ সমস্ত প্রগতিশীল মানুষকেই। ফ্যাসিস্টরা প্রগতির পক্ষের এই বৃহৎ শক্তিকে ভয় পায় বলেই, এই এগিয়ে থাকা শক্তিকে দমিয়ে রাখার জন্য ওরা সদা সচেষ্ট। ওদের এই ভয়ের জায়গাটাই আমাদের শক্তি, এগিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার।

তথ্যসূত্রঃ

https://www.hindustantimes.com/india-news/adani-family-secretly-invested-hundreds-of-millions-in-adani-group-documents-show-the-guardian-101693454540036.html

https://cse.google.com/cse?cx=e1a7e63ac59ae4a39&q=hidenburg#gsc.tab=0&gsc.q=hindenburg&gsc.sort=

লেখক পরিচিতি:

বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। সমাজ-বিজ্ঞানের নানান বিষয়ের উপর বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখকের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় নিয়মিত।

যোগাযোগ: santoshsen66@gmail.com

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top