সন্তোষ সেন
আলোচ্য বিষয়টি আজকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারতে জলবায়ুর ধাক্কা শুধু আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব দ্রুত শ্রমবাজার, কৃষিপণ্য বাজার, গৃহস্থের রান্নাঘর এবং শহরের রাস্তাঘাট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দুর্বল বর্ষা শুধু আবহাওয়াবিদদের উদ্বেগের বিষয় নয়। বরং গ্রামীণ মানুষের আয় কমে যাওয়া, খাদ্যেপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং কাজের সময় কমে যাওয়ার মতো নানান ক্ষেত্রেই এক বড়সড় উদ্বেগের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। এই আশঙ্কা ভারতবর্ষের মতো দেশের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক ভাবে প্রযোজ্য। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ এখন বেসরকারি সংস্থায় অসংগঠিত, স্বল্প বেতনের শ্রমিক। যাদের একটা বড় অংশ জলবায়ু-নির্ভর কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। এমতাবস্থায় এল নিনোকে প্রকৃতি পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়া হিসেবেই বোঝা উচিত। তার আগে দেখে নেওয়া যাক, এল নিনো কী ও এর উৎপত্তির কারণ।
বর্তমান একস্ট্রিম জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর উৎপত্তি
বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস, যেমন কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি। জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমিত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, শিল্পায়ন, হেক্টরের পর হেক্টর বন উজাড়, নগরায়ণ এবং কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত কৃষিকাজের কারণে এই গ্যাসগুলির পরিমাণ বেড়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলেই তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো চরম আবহাওয়াগত ঘটনাগুলি আরও ঘন ঘন ও তীব্র হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, এল নিনো জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফল নয়; এটি প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সংঘটিত একটি প্রাকৃতিক সমুদ্র-ও-বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়া। সাধারণ অবস্থায় পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত ‘Trade Winds’ উষ্ণ সমুদ্রজলকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু কোনো কোনো বছর এই বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে বা দিক পরিবর্তন করলে উষ্ণ জল পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এই অবস্থাকেই এল নিনো বলা হয়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়।
তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। অর্থাৎ, এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর সঙ্গে যুক্ত তাপপ্রবাহ, খরা, বনাগ্নি এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে আরও মারাত্মক হয়ে উঠছে। ফলে প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ওঠানামা এবং মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন আজ একসঙ্গে কাজ করে বৈশ্বিক পরিবেশ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ যেন ঠিক “এক রামে রক্ষে নেই, তার উপর লক্ষণ দোসর”-এর মতো বিষয়।
এল নিনো কেন পরিবেশের ওপর সাংঘাতিক প্রভাব ফেলে?
আমরা আগেই বলেছি, এল নিনো সারা বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। এর ফলে অনেক অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে চরম খরা দেখা দেয়। আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়। এল নিনোর প্রভাবে ভারতবর্ষে প্রায়শই মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল হয়। যার ফলে বর্ষায় বৃষ্টি কম হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, জলসংকট বৃদ্ধি পায় এবং বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ জীববৈচিত্র্য, সমুদ্র-নদী-জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্র এবং মানুষের স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে এল নিনো শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়। বরং এটি পরিবেশ, কৃষি, জলসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুগত ঘটনা।
অর্থনীতির ওপর তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব
প্রথম প্রভাবের প্রধান কারণ অতিরিক্ত গরম ও তীব্র তাপপ্রবাহ। দীর্ঘ ও তীব্র গ্রীষ্মকাল সেইসব শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়, যাদের খোলা আকাশের নিচে কাজ করতেই হয়। যেমন নির্মাণ শ্রমিক, ডেলিভারি কর্মী, পথের হকার এবং কৃষিশ্রমিক। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে তাদের ওপরই। কারণ, তাদের সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সবচেয়ে কম।
ভারত যত বেশি উষ্ণ হচ্ছে, ততো বেশি করে জীবিকা অর্জন ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত গরম কাজের দক্ষতা কমায়, কর্মঘণ্টা হ্রাস করে এবং দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ মানুষের আয়ের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়।
কৃষিতে এল নিনোর প্রভাব
দ্বিতীয় প্রভাবের ক্ষেত্র হলো কৃষি। ২০২৬ সালে ‘রয়টার্স’ প্রকাশিত ভারতের মৌসুমি বৃষ্টিপাত সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টি দেশের ফসল উৎপাদন, জলাধার ও ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার পুনরায় পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় বৃষ্টির প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ করে।
ফলে যখন বৃষ্টিপাত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন চাষবাস ও কৃষিশস্যের ফলন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। সেচের খরচ বাড়ে এবং ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। ফলত জলসংকট তীব্র থেকে তীব্রতম হয়। যেসব ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ইতিমধ্যেই অস্থির বাজারদর ও ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করছেন, তাদের জন্য জলবায়ুগত অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এই অর্থে এল নিনো কেবল একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর একটি বড় ধাক্কা।
মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা
তৃতীয় প্রভাবের পথ হলো মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতি। জলবায়ুর চাপের প্রভাব কৃষকদের বাইরেও সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে খাদ্যদ্রব্যের দামের মাধ্যমে।
পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের (MoSPI) ২০২৬ সালের ‘ভোক্তা মূল্যসূচক’ (CPI) প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে খাদ্যদ্রবের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪.২ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে দুর্বল বর্ষা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করতে পারে।
যদি বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং ফসলের ক্ষতি বাড়ে, তাহলে শাকসবজি, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিশ্চিত করেই দ্রুত বেড়ে যাবে। এর ফলে নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়। কারণ, এমনিতেই জলবায়ুজনিত ধাক্কা একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেয়, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও বাড়িয়ে তোলে।
গ্রাম ও শহরে বৈষম্য বৃদ্ধি
কংক্রিটের বিস্তার এবং সবুজ এলাকার দ্রুত সংকোচনের কারণে ভারতের শহরগুলো ক্রমশ তাপ আটকে রাখার ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। কংক্রিট, অ্যাসফল্ট ও বহুতল নির্মাণ দিনের বেলায় বিপুল পরিমাণ তাপ শোষণ করলেও রাতে সেই তাপ সহজে আর বায়ুমন্ডলে ফেরত পাঠাতে পারছে না। ফলে শহরাঞ্চল আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় বেশি উষ্ণ থাকে। অর্থাৎ, শহরগুলো এক একটি ‘হিট ট্র্যাপ জোনে’ পরিণত হচ্ছে।
কিন্তু এই সমস্যার বোঝা সবাই সমানভাবে বহন করে না। স্বচ্ছল পরিবারগুলি উন্নত বাসস্থান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে, অন্তত কিছুকালের জন্য। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলিকে গাদাগাদি করে বসবাস, জলসংকট এবং দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত গরমের মধ্যে কাজ হয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন গ্রাম ও শহরের বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অর্থাৎ গ্রাম ও শহরের মধ্যে মেটাবলিক রিফ্ট বা বিপাকিয় ফাটল চওড়া হচ্ছে, অর্থাৎ প্রকৃতি ও সমাজের স্বাভাবিক বিনিময়-সম্পর্কের বিচ্ছেদ ক্রমশ বাড়ছে।
উপসংহার
এল নিনো কেবল একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি উন্নয়নের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ভারতের প্রয়োজন আরও শক্তিশালী জলবায়ু অভিযোজন ব্যবস্থা। যেমন তাপ-সহনশীল শহর গড়ে তোলা, শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জলসম্পদের উন্নত ব্যবস্থাপনা।
তবে সবার আগে দরকার জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমানো, পৃথিবীর তাপমাত্রাকে আর বাড়তে না দেওয়া। প্রয়োজন নির্বিচারে সবুজ বনানী ও বন নিধন বন্ধ করা। হিমালয় ও আরাবল্লী পর্বত শ্রেণীকে অক্ষত রাখা। প্রয়োজন নদী-জলাশয় গুলিকে নিজস্ব স্বাভাবিক অবস্থায় বজায় রাখা। আর আজকের দিনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই কাজ করতে হলে সবার আগে দরকার শুধুমাত্র কর্পোরেট পুঁজির বিনিয়োগ, অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত উৎপাদন, বাজার ও মুনাফার কুটিল স্বার্থে প্রাকৃতিক সম্বল লুঠ বন্ধ করা।
কারণ, বর্তমান সময়ে জলবায়ুগত পরিবর্তনই অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আর এই ঝুঁকির সবচেয়ে বড় দায় বহন করতে হচ্ছে সমাজের দরিদ্র মানুষ, প্রান্তিক কৃষক, ক্ষেতমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, রোদে পুড়ে জলে ভিজে খেটে খাওয়া
মানুষজনদেরই ।
ঋণ স্বীকার :
The Hindu -তে প্রকাশিত (৫ জুন, ২০২৬)
Sushanta Mahapatra এবং Madan Meher -এর নিবন্ধ।





