প্রকৃতি যখন অদৃশ্য, মুনাফা তখন দৃশ্যমান: সবুজ মিথ্যার রাজনৈতিক অর্থনীতি

পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে উৎপাদনের হিসাব রাখা হয়—কত পুঁজি লাগলো, কত শ্রম লাগলো, কত লাভ হলো। কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না—এই উৎপাদনের ফলে কতটা মাটি মারা পড়লো, কতটা জল বিষাক্ত হলো, কতটা বাতাস শ্বাস নেওয়ার অযোগ্য হয়ে উঠলো।

বঙ্কিম দত্ত

পুঁজিবাদ আমাদের শেখায়—যার দাম নেই, তার কোনো মূল্য নেই। এই একবাক্যের দর্শনই আজকের পরিবেশ বিপর্যয়ের গভীরতম তত্ত্ব। জল, মাটি, বাতাস, বন—যেগুলি ছাড়া মানুষের জীবন, শ্রম ও সভ্যতা অসম্ভব—সেগুলিই পুঁজিবাদী দৃষ্টিতে সবচেয়ে “সস্তা”, কারণ সেগুলির কোনো বাজারদর নেই। আর সস্তা বলেই সেসব  লুটযোগ্য। লুটযোগ্য বলেই সেগুলি অদৃশ্য। এটাই  হ’লো প্রাকৃতিক মূল্যের অদৃশ্যকরণ।

পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে উৎপাদনের হিসাব রাখা হয়—কত পুঁজি লাগলো, কত শ্রম লাগলো, কত লাভ হলো। কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না—এই উৎপাদনের ফলে কতটা মাটি মারা পড়লো, কতটা জল বিষাক্ত হলো, কতটা বাতাস শ্বাস নেওয়ার অযোগ্য হয়ে উঠলো। প্রকৃতির অবদান ও ক্ষতি—দুটোই এক্ষেত্রে হিসাবের বাইরে। এই “বাইরে রাখা” কোনো প্রযুক্তিগত  সীমাবদ্ধতা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

কারণ প্রকৃতির প্রকৃত মূল্য যদি দৃশ্যমান হয়, তবে মুনাফার হিসাব ভেঙে পড়বে। আর এই অদৃশ্যকরণ কোনো দুর্ঘটনাও নয়। এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল।তাই কর্পোরেট ব্যালান্স শিটে লাভের অঙ্ক থাকে, কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না—এই লাভের জন্য কতটা ভবিষ্যৎ চুরি হলো। প্রকৃতি ধ্বংস এখানে অপরাধ নয়; এটি হিসাবের বাইরে রাখা “খরচ”।

এই অদৃশ্যকরণ শুধু সংখ্যার মাধ্যমে নয়, ভাষার মাধ্যমেও ঘটে। বনকে বলা হয় “ফরেস্ট রিসোর্স”, নদীকে “ওয়াটার রিসোর্স”, পাহাড়কে “মিনারেল বেল্ট”। জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র পরিণত হয় কাঁচামালের ভাণ্ডারে, সম্বল হয়ে ওঠে  সম্পদ। পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে “রিসোর্স” বলে ডাকে। এই শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সহিংসতা। বন আর জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র নয়—সে কাঠ। নদী আর সামাজিক-প্রাকৃতিক জীবনরেখা নয়—সে জলসম্পদ। পাহাড় আর ভূদৃশ্য নয়—সে খনিজ ভাণ্ডার। ভাষার এই রূপান্তরেই প্রকৃতির জীবনমূল্য মুছে যায়, সামনে আসে কেবল ব্যবহারযোগ্যতা। এই ভাষা নিরীহ নয়—এটি শোষণের পূর্বশর্ত। যে জীবন্ত, তাকে হত্যা করতে হলে আগে তাকে প্রাণহীন বস্তুতে নামাতে হয়। প্রাকৃতিক মূল্য অদৃশ্য হলে—মানুষ বুঝতে পারে না তার জীবন কোন শর্তের ওপর দাঁড়িয়ে। 

উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের সংযোগ ভেঙে যায়। এটাই মেটাবলিক রিফ্ট। মানুষ তখন এমন এক সমাজ গড়ে তোলে যা নিজের  অস্তিত্বের শর্ত ধ্বংস করেই টিকে থাকতে চায়।

বাস্তুসমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিতে প্রশ্নটা পরিষ্কার—আমরা কি প্রকৃতিকে বাঁচাতে চাই, না কি তার ধ্বংসকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করতে চাই? প্রকৃতির মূল্য মানে তার দাম নয়। প্রকৃতির মূল্য মানে তার অস্তিত্বের শর্ত, মানুষের জীবনের ভিত্তি।

এরপর আসে সবুজ মুখোশ। পরিবেশ ধ্বংসের এই যুগে পুঁজিবাদ বুঝেছে—খোলাখুলি লুট করলে রাজনৈতিক বৈধতা পাওয়া যাবে না। তাই সে নতুন ভাষা শিখেছে: কার্বন ক্রেডিট, নেট-জিরো, ESG, গ্রিন গ্রোথ। এখানে প্রকৃতি আর জীবনশর্ত নয়; সে হয়ে ওঠে পরিমাপযোগ্য ইউনিট। একটি বন মানে আর মানুষ, প্রাণী ও মাটির সহাবস্থান নয়  বরং কত টন কার্বন শোষণ।

এই কার্বন শোষণ আবার কর্পোরেট দূষণের লাইসেন্স জোগায়।

একদিকে কর্পোরেট সংস্থা দূষণ চালায়, অন্যদিকে গ্লোবাল সাউথের কোনো প্রান্তে একটি বন দখল করে “অফসেট” করে। স্থানীয় মানুষ উৎখাত হয়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, কিন্তু কর্পোরেট রিপোর্টে লেখা থাকে—“environmentally responsible”। প্রকৃতির বাস্তব মূল্য অদৃশ্য; দৃশ্যমান শুধু বাজারযোগ্য সার্টিফিকেট।

এই ব্যবস্থায় পরিবেশ সংকট আর রাজনৈতিক প্রশ্ন থাকে না। তা হয়ে ওঠে ম্যানেজমেন্টের সমস্যা, ফিন্যান্সের সুযোগ, নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র। প্রকৃতি রক্ষা তখন সংগ্রাম নয়, প্রজেক্ট। নাগরিক প্রতিবাদ নয়, কনসালটেন্সি।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই অদৃশ্যকরণ মানুষের চেতনাকেও বিকৃত করে। আমরা ভাবতে শুরু করি, দাম বাড়লেই প্রকৃতি বাঁচবে, সবুজ পণ্য কিনলেই দায়িত্ব শেষ। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—এই ব্যবস্থাকে “সমাধান” হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাজারই প্রকৃতি বাঁচাবে। অথচ বাজারই সেই কাঠামো, যা প্রকৃতিকে অদৃশ্য করেছে। এটি এমনই যেন আগুনকে দিয়ে আগুন নেভানোর দাবি। আমরা ভুলে যাই—বাজারই সেই কাঠামো, যা প্রকৃতিকে অদৃশ্য করে রেখেছে।

বাস্তুসমাজতান্ত্রিক রাজনীতি এখানেই হস্তক্ষেপ করে। সে বলে—প্রকৃতির মূল্য কোনো বাজারদর নয়। বাস্তুসমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিতে প্রশ্নটা পরিষ্কার—আমরা কি প্রকৃতিকে বাঁচাতে চাই, না কি তার ধ্বংসকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করতে চাই? প্রকৃতির মূল্য মানে তার দাম নয়। প্রকৃতির মূল্য মানে তার অস্তিত্বের শর্ত, মানুষের জীবনের ভিত্তি। প্রকৃতির মূল্য তার জীবনধারণমূলক ভূমিকা, তার পুনরুৎপাদন ক্ষমতা, তার সঙ্গে মানুষের বিপাকীয় সম্পর্ক। এই মূল্যকে দৃশ্যমান করা মানে—পুঁজিবাদী হিসাব ভাঙা, সবুজ মিথ্যা উন্মোচন করা এবং প্রকৃতিকে আবার রাজনৈতিক প্রশ্নে ফিরিয়ে আনা।

পরিবেশ সংকটের মূলে প্রকৃতির অভাব নেই, অভাব আছে পরিবেশের স্বীকৃতির।

বাস্তুসমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিতে প্রশ্নটা পরিষ্কার—আমরা কি প্রকৃতিকে বাঁচাতে চাই, না কি তার ধ্বংসকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করতে চাই? প্রকৃতির মূল্য মানে তার দাম নয়। প্রকৃতির মূল্য মানে তার অস্তিত্বের শর্ত, মানুষের জীবনের ভিত্তি। প্রকৃতিকে আবার দৃশ্যমান করতে হবে—শ্রমের সহচর, সমাজের ভিত্তি এবং ভবিষ্যতের শর্ত হিসেবে।

সবুজ মুখোশ খুলে ফেলতেই হবে। যতদিন প্রকৃতি কেবল বাজারে ধরা পড়বে, জীবনে নয়—ততদিন সবুজ উন্নয়ন কথাটি পুঁজিবাদের সবচেয়ে সফল মিথ্যাই থেকে যাবে। আর প্রকৃতি অদৃশ্য থাকলে, ধ্বংসই একমাত্র দৃশ্যমান বাস্তবতা হয়ে ওঠে। প্রশ্নটা তাই আর শুধু পরিবেশ রক্ষার নয়—প্রশ্নটা হলো, কোন সমাজব্যবস্থায় প্রকৃতি দৃশ্যমান থাকবে:

মুনাফার সমাজে, না  সমতার সমাজে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top