নারীবাদ Archives - Pariprashna https://pariprashna.in/tag/নারীবাদ/ Thu, 15 Jun 2023 18:37:45 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=7.1.2 https://i0.wp.com/pariprashna.in/wp-content/uploads/2018/03/cropped-pariprashna-Logo-1-2.jpg?fit=32%2C32&ssl=1 নারীবাদ Archives - Pariprashna https://pariprashna.in/tag/নারীবাদ/ 32 32 182578982 সবহারাদের হারানিধি https://pariprashna.in/article/society/womens-unpaid-capitalism/ https://pariprashna.in/article/society/womens-unpaid-capitalism/#comments Thu, 15 Jun 2023 18:37:40 +0000 https://pariprashna.in/?p=2352 বঙ্কিম দত্ত প্রজাতি সংরক্ষণের প্রশ্নে নারীর উৎপাদনশীল ভূমিকা নারীকে অনন‍্য করেছে অনন্তকাল ধরে। প্রজাতি সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য সম্ভব হয়েছে প্রকৃতি সংরক্ষণ ও বির্বতনের মাধ‍্যমে। সুদূর অতীত থেকেই এই মিথোজীবী সম্পর্কে নারী ও প্রকৃতি অন্বিষ্ঠ বিশেষভাবে। তাই প্রকৃতি সংরক্ষণে নারীদের রয়েছে অনন‍্য ভূমিকা। জীবনের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের কাজে নারীকে সেকারণে প্রকৃতির প্রতিরূপ ভাবা হয়। অথচ প্রজাতি […]

The post সবহারাদের হারানিধি appeared first on Pariprashna.

]]>
বঙ্কিম দত্ত

প্রজাতি সংরক্ষণের প্রশ্নে নারীর উৎপাদনশীল ভূমিকা নারীকে অনন‍্য করেছে অনন্তকাল ধরে। প্রজাতি সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য সম্ভব হয়েছে প্রকৃতি সংরক্ষণ ও বির্বতনের মাধ‍্যমে। সুদূর অতীত থেকেই এই মিথোজীবী সম্পর্কে নারী ও প্রকৃতি অন্বিষ্ঠ বিশেষভাবে। তাই প্রকৃতি সংরক্ষণে নারীদের রয়েছে অনন‍্য ভূমিকা। জীবনের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের কাজে নারীকে সেকারণে প্রকৃতির প্রতিরূপ ভাবা হয়। অথচ প্রজাতি ও প্রকৃতি সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সহায়ক এই ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও নারী অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজের যুপকাষ্ঠে বলিপ্রদত্ত। সভ‍্যতার অতি প্রাচীনকাল থেকেই নারী-পুরুষের প্রাকৃতিক বিভিন্নতা (তৃতীয় লিঙ্গবিচারে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বলা বেশী শ্রেয়) পুরুষের আনুকূল‍্যে বৈষম‍্যে ও বিভেদে চুড়ান্ত রূপ নিয়েছে। শ্রমশোষণের পুঁজিবাদী ব‍্যবস্থা সবসময়ই চুড়ান্ত নিষ্পেষণমূলক। বর্তমানে পুঁজি সঞ্চয়নের সূচকীয় গতিবৃদ্ধি নারী ও প্রকৃতি শোষণে সমানভাবেই সক্রিয় ও সেই শোষণ স্বৈরতান্ত্রিক।

পুঁজিবাদ নারীকে মাতৃত্বের জন্য শাস্তিই যে দেয় তাতে সন্দেহ নেই, তবে এটা ঠিক নয় যে নারীরা সন্তান নিক তাপুঁজিবাদ চায় না। বিপরীতে, পুঁজিবাদের জন্য, মহিলারা ভবিষ্যত শ্রমিকদের ক্রমাগত উৎপাদনের অবৈতনিক উৎস। তবে, পুঁজিবাদ সন্তান ও পরিবারের জন্য নারীদের প্রতি মাতৃত্ব এবং ত্যাগের প্রশংসা করার ক্ষেত্রে , পিতৃতন্ত্রের উপরই নির্ভর করে। এইভাবে নারী-পুরুষের মধ‍্যেকার অপরাধমূলক বৈষম্যকে তারা চোখের আড়ালে রাখতে চায়।

‘জেন্ডার সোশ্যাল নর্মস ইনডেক্স’ (২০২৩)-এর নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। সেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা- এমন নানা ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অধিকারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। বিশ্ব জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশের অবস্থার উপর সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরী সেই সূচকে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে মি-টু (Me too)-এর মতো জোরালো আন্দোলন সত্ত্বেও গত এক দশকে মহিলাদের প্রতি বৈষম্য কমেনি।

পুঁজিবাদী ব‍্যবস্থায় নারীদের সন্তান উৎপাদন ও লালন-পালন এবং ভবিষ্যৎ শোষণের প্রয়োজনে আরও বেশি সংখ্যক শ্রমিক তৈরি করার জন্য পারিশ্রমিক না দেওয়াটা এই আর্থিক ব‍্যবস্থারই ‘সিগনেচার’।

নারীরা গড়ে প্রতিদিন 7.2 ঘন্টা গৃহস্থালির কাজে ব্যয় করে, এবং যেহেতু তারা এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মশক্তির অংশ নয়, অর্থনৈতিক পরিমাপ বা নীতি তাদের বিবেচনায় রাখে না। বরং এটা বছরের পর বছর ধরে জানা যে, একই কাজের জন্য নারী শ্রমিকদের, তাদের পুরুষ সহযোগীদের তুলনায় কম বেতন দেওয়া হয় এবং বিশ্বব্যাপী (খোদ মার্কিন দেশের ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বছরভর কাজের চুক্তিতে পুরুষরা ১ ডলার বেতন পেলে মহিলারা পেয়েছেন ৮৪ সেন্ট। আর চুক্তিহীন কাজের ক্ষেত্রে মহিলারা পেয়েছেন ৭৭ সেন্ট, কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার ক্ষেত্রে যা আরো কম, ৫৪ সেন্ট মাত্র। অর্থাৎ মহিলাদের প্রাপ্তি বেড়েছে ঠিকই কিন্তু বৈষম্য মোছেনি)। কম বেতনের চাকরিতেই নারীদের বড়ো অংশ নিয়োজিত।

একটি উদাহরণ – দক্ষিণ এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কৃষি-শ্রমিক নারী। যদিও আমরা যখন কৃষকদের কথা চিন্তা করি তখন আমাদের মস্তিষ্কে পুরুষদের মুখই ভিড় করে আসে।

নারীদের ক্ষেত্রে বেগার শ্রম শব্দটি সাধারণত যত্নের কাজের (caregiving) সঙ্গে জড়িত – শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ এবং পরিবারের যত্ন: এগুলোর বেশিরভাগই “মহিলাদের কাজ” হিসাবে বিবেচিত হয়। বেশিরভাগ যত্নের কাজের জন্য, পুঁজিবাদ কোন পারিশ্রমিক প্রদান করে না; পরিবর্তে, “পেমেন্ট” হিসাবে বরাদ্দ হয় নারীর “মাতৃ-প্রকৃতির” প্রশংসা। শ্রমিক শ্রেণীর সদস্য হিসাবে যেটুকু অধিকার তাও লঙ্ঘিত হয় এইভাবে। ‘আন্তর্জাতিক সমান বেতন দিবস’ 2022-এ জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা নিশ্চিত করে যে “নারীরা পুরুষদের তুলনায় কমপক্ষে 2.5 গুণ বেশি অবৈতনিক কাজ করে।”

2018 সালে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-র রিপোর্ট ‘কেয়ার ওয়ার্ক এবং কেয়ার জবস ফর দ্য ফিউচার অফ ডিসেন্ট’ জানাচ্ছে – এই অবৈতনিক যত্ন এবং গার্হস্থ্য কাজের মূল্য বিশ্বের মোট জিডিপি-এর 9% অর্থাৎ 11 ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

64টি দেশে সংগৃহীত সময়-ব্যবহারের সমীক্ষার উপর ভিত্তি করে দেখা গেছে যে প্রতিদিন 16.4 বিলিয়ন ঘন্টা অবৈতনিক পরিচর্যা কাজে ব্যয় করা হয়। এই অবৈতনিক পরিচর্যা কাজের মোট ঘন্টার 76.2 শতাংশ মহিলাদের দ্বারা সম্পাদিত ৷ অন্যভাবে বললে, সারা বিশ্বে মহিলাদের দৈনিক অবৈতনিক পরিচর্যার কাজ হলো 1.5 বিলিয়নেরও বেশি মহিলাকে বিনা বেতনে দিনে আট ঘন্টা কাজ করার সমতুল্য (সূত্র : Tricontinental: Institute for Social Research )।

“আমাদের বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় যে অর্থনীতিতে অবৈতনিক মহিলাদের মোট অবদান প্রায় 22.7 লক্ষ কোটি টাকা (গ্রামীণ: 14.7 লক্ষ কোটি টাকা এবং শহুরে: 8.0 লক্ষ কোটি টাকা) যা ভারতের জিডিপির প্রায় 7.5 শতাংশ,” জানাচ্ছে স্টেট ব‍্যাঙ্কের একটি সাম্প্রতিক (2023) প্রতিবেদন। মহিলাদের, বিশেষ করে, তাদের 20 – 30 বছর বয়সের সময়, ‘সন্তানের জন্য যত্নের সঙ্গে পেশাগত কাজের ভারসাম্য বজায় রাখা’-র দ্বন্দ্বে পেশা ত্যাগ করতে হয় বা শ্রম-সময় কমাতে হয়। তারা পরে কাজ ফিরে পেতে চাইলে, ঐ সময়কালীন বেতন বৃদ্ধি এবং পদোন্নতি যা তাদের পুরুষ সহযোগীরা পায়, তা থেকে বঞ্চিত হয় এবং এইভাবে একই কাজ করা পুরুষদের তুলনায় এই নারীরা তাদের বাকি কর্মজীবন জুড়ে কম মজুরি পায়। এটি বিশেষত ছোট বা কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই, এমন চাকরির ক্ষেত্রে প্রধানত সত্য এবং প্রায় 90% মহিলা এই ধরনের কাজই করে, বলা ভালো যে করতে বাধ্য হয়৷

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), তার সমান পারিশ্রমিক দেওয়ার আহ্বানটি জানিয়েছে 1951 সালের কনভেনশনে –”সমান মূল্যের কাজের জন্য পুরুষ ও মহিলা শ্রমিকদের সমান পারিশ্রমিক”। অথচ রূঢ় বাস্তব হলো, 70 বছরেরও বেশি সময় পার ক’রেও মজুরির লিঙ্গভিত্তিক এই অসমতা বেশিরভাগই ক্ষেত্রেই চলছে, এমনকি তা অস্বীকৃতই থাকছে।

“শ্রমের লিঙ্গ বিভাজন, গার্হস্থ্য ক্ষেত্রে নারীর কাজের স্বাভাবিকীকরণ (Naturalisation) এবং উৎপাদনশীল কাজের তুলনায় প্রজনন কাজের অব-মূল্যায়নকে চ্যালেঞ্জ করুন,” শ্লোগান তুলছে World March for Women (WMW)। ওয়ার্ল্ড মার্চ ফর উইমেন হল একটি আন্তর্জাতিক নারীবাদী আন্দোলন যা লিঙ্গ সমতার পক্ষে প্রচার করে এবং মহিলাদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাদের প্রতি সহিংসতা হ্রাস করার কাজে তদারকি করে। সমাধান হিসাবে WMW এর বক্তব‍্য –গার্হস্থ্য এবং পরিচর্যা কাজের পুনর্গঠন, যাতে এই কাজের দায়িত্ব একটি পরিবার বা সম্প্রদায়ের পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয়।

এটি বাস্তবে পরিণত হওয়ার জন্য, সংস্থাটি সামাজিক উৎপাদন (যেমন ক্রেজ, যৌথ লন্ড্রি এবং রেস্তোরাঁ, বয়স্কদের যত্ন ইত্যাদি) সমর্থনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগুলি প্রনয়ণ ও গ্রহণের দাবি করে। সেইসঙ্গে বেতন ছাঁটাই ছাড়াই কাজের সময় কমানোটাও তাদের অন‍্যতম দাবী।

এই সমস্যাগুলির সমাধানের লক্ষ‍্যে WMW পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে “নারীবাদী অর্থনীতি” দ্বারা প্রতিস্থাপন করার আহ্বান জানায়, যা “নারীবাদী বৈশিষ্ট্য সহ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” হিসাবে বিবেচিত হতে পারে বলে এই আন্তর্জাতিক উদ‍্যোগটি মনে করে। শ্রমিক শ্রেণীর সহায়তার জন‍্য এই নারীবাদী উদ‍্যোগটি সামাজিকভাবে বিপ্লবী কিছু ভূমিকা নেবার আহ্বান জানিয়ে নানা আন্তর্জাতিক প্রতিবাদী মঞ্চে ভূমিকা নেয়।

গার্হস্থ্য কাজে (বেগার-শ্রম) নারীদের প্রাধান্যকারী ভূমিকা এবং প্রচলিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের প্রান্তিক অবস্থান একটি পরিসংখ্যাননিষ্ঠ তথ‍্য। এই কারণে বিভিন্ন দেশের সরকারই অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক নীতির পরিধির বাইরে রাখে নারীদের অবদানকে। বেগার শ্রম, পুঁজিবাদী অর্থনীতিজাত কম মজুরি এবং হীন ও আদিম পেশাগ্রহণের বাধ‍্যবাধকতা এই ত্রহ‍্যস্পর্শযোগের ভারকেন্দ্রে এদেশে রয়েছে মনুবাদী সংস্কৃতি, যা নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে দেখে ও গৃহকর্মে সুনিপুণা হবার জন‍্য গৃহবন্দী রাখতে চায়।

অবস্থার অচলতার নিষ্পেষণ যত চেপে বসছে নারীদের উপর, সমাজের একটা উল্লেখযোগ‍্য অংশ ততই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তাকে অধিকতর শ্রেয় মনে করছে; আসলে শংকরাচার্য প্রণীত মায়াবাদেরই প্রতিফলন এসব। যদি এমনটাই চলতে থাকে তবে নারী ও প্রকৃতির অন্তর্জলি যাত্রায় পুরুষের শরিক থেকে শিকার হওয়াটা স্বল্প সময়ের অপেক্ষা।

সমাজ ও অর্থনীতিতে নারীদের হীন অবস্থানকে সভ‍্যতার সংকট হিসাবে আর কবে আমরা দেখবো!

‘রাত কত হইল?’

উত্তর মেলে না।

পুনশ্চ : “প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে প্রাকৃতিক সম্পর্ক, তাই নির্ধারণ করে পুরুষের সঙ্গে নারীর সম্পর্ক কীভাবে রয়েছে। সেই সম্পর্কই মানব সমাজের বিকাশের মাপকাঠি। নারীকে যদি ব‍্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে না ভেবে প্রাকৃতিক সৃষ্টি হিসাবে ধরা হয়, তাহলেই পুরুষ-নারীর সম্পর্ক প্রাকৃতিক হয় এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানবসমাজের সম্পর্কও প্রাকৃতিক হয়” (একুশ শতকের মার্কসবাদ—অরূপকুমার ঘোষ)


তথ‍্যসূত্র :

1.The Print-এ প্রকাশিত একাধিক প্রবন্ধ

2. Saheli Chowdhury-এর প্রবন্ধ:

Proletariat of the Proletariat: Women’s Unpaid (Janata weekly, 4/6/2023)

The post সবহারাদের হারানিধি appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/society/womens-unpaid-capitalism/feed/ 1 2352
নারী: সেকাল, একাল, ভাবীকাল https://pariprashna.in/article/society/women-past-present-future/ https://pariprashna.in/article/society/women-past-present-future/#comments Thu, 05 Aug 2021 07:09:01 +0000 https://pariprashna.in/?p=1756 আজও মানব সমাজে প্রয়োজনীয় কায়িক শ্রমের ৬০ শতাংশ মেয়েরা করে। শ্রমের দুনিয়ায় সস্তা হিসাব পা রাখতে দিলেও রাজনৈতিক আঙিনায় নারী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পায়নি বহুদিন।

The post নারী: সেকাল, একাল, ভাবীকাল appeared first on Pariprashna.

]]>
প্রীতিলতা বিশ্বাস

মানুষের প্রাগৈতিহাসিক গোষ্ঠী সমাজে নারীর গুরুত্ব ছিল সমধিক। খাদ্য সংগ্রহের সেই পর্যায়ে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক প্রাণিজগতের আর পাঁচটি প্রাণীর মতই। খাদ্যের অনিশ্চিয়তা, হিংস্র জন্তুর আক্রমণে প্রজাতির ক্ষয় তার নিত্যসঙ্গী। নারীর পুনরুৎপাদনের ক্ষমতা তাকে টিকিয়ে রাখে প্রকৃতির কোলে, আর তাই সেদিন তার মাতৃত্ব ছিল পূজনীয়। খাদ্যসংগ্রহের পরবর্তী পর্যায়ে মানুষ হাতিয়ার তৈরী করতে শিখেছে। আর পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতায় গভীর জঙ্গলে শিকারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই পর্যায়ে ঘটে নারী-পুরুষের মধ্যে প্রথম শ্রম বিভাজন। সন্তানসম্ভবা নারী বা নাবালক শিশুর মায়েরা ঝুঁকিপূর্ণ শিকারে না গিয়ে নিরাপদ স্থানে গেঁড়ি-গুগলি, ফল-পাকুড় বা কন্দমূল সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এই নিরাপদ গণ্ডির মধ্যে ঘোরা-ফেরা করতে করতে মেয়েরা একটি জিনিস আবিষ্কার করে ফেলে। ফলের বীজ থেকে চারা গাছ আর তার থেকে আবার ফল—এই চক্রটিকে তারা বুঝতে পারে। সেখান থেকে শুরু হয় মানব সভ্যতার প্রাথমিক কৃষিকাজ। কৃষি তাই নারীর আবিষ্কার এবং প্রথম অবস্থায় তারই দায়িত্ব। ওদিকে শিকারে যাওয়া পুরুষেরা কুকুর, গরু, ছাগল ইত্যাদির ছোট বাচ্চা না মেরে সঙ্গে করে নিয়ে আসত। ক্রমে তারা পশু প্রতিপালন এবং পুনরুৎপাদনের  কাজটিও রপ্ত করে। শুরু হয় পশুপালন। পৃথিবীর সর্বত্র কৃষিকাজ ও পশুপালন—এই দুটি কাজ মানুষ একই ক্রমে শেখে নি। প্রকৃতি, পরিবেশ, আবহাওয়া ইত্যাদির উপর নির্ভর করে কোনোটা আগে কোনোটা পরে শিখেছে। দুই ক্ষেত্রেই এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে মানুষের গোষ্ঠী জীবনে। এই প্রথম সে খাদ্য উৎপাদন করতে শিখলো, পেল উদ্বৃত্ত খাদ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তা। 

মাতৃতান্ত্রিক থেকে পুরুষতান্ত্রিকতায় যাত্রা

যে পরিবেশে কৃষিকাজকে মানুষ এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে সেখানে প্রয়োজন হয়েছে আরো অনেক কিছুর। গৃহনির্মান, মাটিরপাত্র, ঝুড়িবোনা ইত্যাদি সব কিছুই সেদিন শুরুটা হয়েছে মেয়েদের তথা মায়েদের হাতে। এমনকী এসবের জন্য প্রয়োজনীয় হাতিয়ারগুলোও তারাই বানিয়েছে। আর শিশুদের সুস্থ-সবল করে বড় করা তো মায়েরই কাজ। সেই সূত্রে জড়ি-বুটির চিকিৎসায় হাতেখড়িও মেয়েদের কৃতিত্ব। তাই সেদিনের কৃষি নির্ভর এই সমাজগুলি ছিল মাতৃ প্রধান। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, আমাদের প্রাচীনতম তিনটি সভ্যতা—সুমের, মিশর এবং হরপ্পা-মহেঞ্জোদড়ো—প্রতিটিই ছিল কৃষি ভিত্তিক। যেখানে মানুষ আগে পশুপালন শিখেছে সেখানে কিন্ত তার জীবন হয়েছে যাযাবরের, আর তাতে থেকেছে পুরুষের প্রাধান্য। যদিও এই জীবনেও খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ঝুড়ি বোনা, পশুর চামড়া দিয়ে গায়ের আচ্ছাদন ইত্যাদি মেয়েরাই তৈরী করেছে।

খাদ্য নিরাপত্তা গোষ্ঠীগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে সাহায্য করেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন এবং শ্রমবিভাজন দুই-ই বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রয়োজনের তাগিদে গোষ্ঠীর সঙ্গে গোষ্ঠীর আদান-প্রদান শুরু হয়েছে। এই বিনিময় তার মধ্যে জন্ম দিয়েছে নতুন এক বোধের—মালিকানা বোধ। প্রাথমিক অবস্থায় এই মালিকানা ছিল গোষ্ঠী মালিকানা বা যৌথ মালিকানা। এই অবস্থায় মানুষের মধ্যে প্রচলিত বিবাহ ব্যবস্থা ছিল অনেকটাই শিথিল প্রকৃতির। উন্নত পর্যায়ের কৃষিকাজে পশুর ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে প্রধান উৎপাদকের ভূমিকা গ্রহন করেছে পুরুষেরা। নারী হয়ে গেছে তার সহকারী, গৌণ। ক্রমে যৌথ-মালিকানা থেকে ব্যাক্তি মালিকানায় উত্তরোন ঘটেছে সমাজের। বিনিময় প্রথায় দেখা দিয়েছে মুদ্রার প্রচলন। গৃহ নির্মাণ, কুমোর, কামার ইত্যাদি সব কাজেই পুরুষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সন্তানের জন্ম দেওয়া ও তার প্রতিপালনের সঙ্গে অন্যান্য গৃহকাজ যেমন নারীরা সামলেছে, তেমনই ধান সিদ্ধ করে শুকানো, হাঁস-মুরগী ঘরে তোলা বা গরুকে খাবার দেবার মতো কাজ সেদিনও যেমন করেছে আজও তেমন গ্রামাঞ্চলের মায়েরা নিঃশব্দে করে থাকেন। কিন্তু অর্থনীতির নিরিখে এর কোনটাই উৎপাদনের আওতায় পড়ে না। মানব প্রজাতির পুনরুৎপাদন ও প্রতিপালনের মতো একটি কাজও কোন স্বীকৃতি ছাড়াই মেয়েরা করে চলেছে। সভ্যতার শৈশাবস্থায় যে স্বাধীনতা মেয়েরা ভোগ করত, ক্রমে ক্রমে তার সবটুকুই কেড়ে নেওয়া হয়। শ্রমবিভাজনের ফলে সমস্ত গৃহশ্রমের দায় তার উপর চেপে যায়, আর অন্যদিকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য তার উপর নেমে আসে কঠিন শৃঙ্খলার এক যাপন। যদিও পুরুষেরা তাদের বাইরের কাজের জগতে স্বাধীন এবং বহুগামীই থেকে যায়। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র মেয়েরা এই পর্যায়ে গৃহবন্দী এবং অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভশীল জীবন-যাপনে বাধ্য হয়েছে। ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে গুপ্ত যুগ থেকে উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত নারীরা বিশেষতঃ বর্ণ হিন্দু নারীর জীবন ছিল দুর্বিষহ। এই প্রসঙ্গে পরে আবার ফিরবো।

শিল্প- বিপ্লবের যুগে নারী

১৭৬০—১৮৪০ এই সময়কালকে বলা হয় বৃটেনের শিল্প-বিপ্লবের যুগ। বৃটেনের শিল্প-বিপ্লব নারীকে গৃহশ্রমের বাইরে বৃহত্তর শ্রমের আঙিনায় নিয়ে এসে ফেলল। বস্ত্রশিল্পে বহু মহিলাকে নিয়োগ করা হলো। এছাড়াও কারখানার বিভিন্ন কায়িক শ্রমে তাদের নিযুক্ত করা হতে লাগল। এই নিয়োগের প্রধান কারণ পুরুষের তুলনায় অনেক কম মজুরিতেই নারীদের দিয়ে ভালো কাজ পাওয়া যেত। শিক্ষাগত দক্ষতা না থাকায় বৌদ্ধিক শ্রম থেকে তাদের দূরেই রাখা হল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীরা প্রথম প্রবেশের সুযোগ পায় ১৯৪৭ সালে। শিল্প-বিপ্লবের এটা ছিল প্রাথমিক সামাজিক অভিঘাত। শিল্প-বিপ্লবের হাত ধরে যে পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিকাশলাভ করে তার বিশ্বব্যাপী বাজার দখলের লড়াই-এ বিংশ শতকের প্রথমার্ধে গোটা বিশ্ব আন্দোলিত হয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধকালীন সময়ে পুরুষেরা যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার কারণে অনেক বেশি পরিমানে নারীরা যুক্ত হল বাইরের শ্রমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর সময়ে যখন উপনিবেশগুলি থেকে সরাসরি হাত গুটিয়ে নিতে হল ইউরোপকে তখন মহিলাদের তুলনামূলক সস্তাশ্রমে নিয়োগ কিঞ্চিত বৃদ্ধি পেল। বাইরের শ্রমে থাকলেও তার গৃহশ্রমের দায়িত্ব কিন্ত কোন অংশে কমে নি। আর মাতৃত্বের দায়িত্ব তো তাকেই বহন করতে হবে। আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলে বড়জোর গৃহে একজন সাহায্যকারী নিয়োগ করা সম্ভব হতো, যদিও ইউরোপে এখন আইন করে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আজও মানব সমাজে প্রয়োজনীয় কায়িক শ্রমের ৬০ শতাংশ মেয়েরা করে। শ্রমের দুনিয়ায় সস্তা হিসাব পা রাখতে দিলেও রাজনৈতিক আঙিনায় নারী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পায়নি বহুদিন। ইউরোপের প্রতিটি দেশেই নারীর ভোটাধিকার পেতে অনেক দেরি হয়। রেনাসাঁসের দেশ ফ্রান্সেই মেয়েরা ভোটাধিকার পায় ১৯৪৬ সালে।

 রামমোহন বিদ্যাসাগরের যুগে ভারতবর্ষের মেয়েরা

এবার পুনরায় আসব ভারতের নারী সমাজ প্রসঙ্গে। রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে ১৮২৯ সালে হওয়া সতীদাহ নিবারণ এবং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদ্যোগে ১৮৫৬ সালে হওয়া বিধবা বিবাহ আইন বাংলা তথা ভারতীয় সমাজ সংস্কারে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ক্রমে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে উদার মনস্ক মানুষেরা নারী শিক্ষার কাজে এগিয়ে আসেন। বিশ শতকে ভারতীয় নারীরা যেমন স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেছে তেমনই গৃহকাজের সঙ্গে বাইরের কাজের জগতেও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। আজও তার ধারাবাহিকতা চলছে। এতদসত্বেও মর্যাদা পায়নি তার গৃহশ্রম, তার মাতৃত্ব। আজও মেয়েকে বিয়ের পর শশুরবাড়িতে থাকা-খাওয়ায় বেঁচের থাকার জন্য বাবাকে দিতে হয় মোটা অংকের পণ। তবুও শেষ রক্ষা হয় না বহু ক্ষেত্রেই। ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী সারা ভারতে পণের জন্য বধূহত্যার ঘটনা ৭০০০ ছাড়িয়ে গেছে।

পুঁজিবাদী সমাজে মেয়েদের অবস্থান

শ্রমজীবী মানুষের মজুরি নির্ধারিত হয় তার পরিবারসহ জীবন চালাতে যে পরিমাণ ব্যয় হতে পারে তার হিসাবে। এখানে একজন শ্রমিক একদিন কারখানা থেকে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে পরেরদিন পুনরায় কাজ করার শক্তি সঞ্চয় করার জন্য গৃহে যে সকল পরিষেবা দরকার হয় তার কোন মূল্যই হিসাব করা হয় না। পারিবারিক বন্ধন নামক গালভরা কথার ফাঁকি দিয়ে তা নিঃশব্দে চাপিয় দেওয়া হয় বাড়ির মহিলাদের উপর। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠান, পরিবার নামক এককটি তাই ভীষণ প্রয়োজনীয়। ভবিষ্যত শ্রমিকের উৎপাদন ও প্রতিপালনও এই পরিবার নামক ছত্রছায়ায় হয়ে যায়। বহুক্ষেত্রে পুরুষেরা সম্পূর্ণ দায় মায়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে চলে যায়। আবার সেই পুঁজিবাদই অপেক্ষাকৃত সস্তা শ্রমের যোগানদার হিসাবে নারীকে টেনে আনে বাইরের শ্রমের জগতে। নারীর শ্রমটুকুই শুধু শোষনের বিষয় নয়, তার শরীর, তার গোটা অস্তিত্বকেই পণ্যে পরিণত করে পুঁজি। তাই নানান পণ্যের বিজ্ঞাপনে দেখানো হয় তার অর্ধনগ্ন শরীর। আর দেহ-ব্যবসাকে তো বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর আদিমতম ব্যবসা। যৌথ কৌম সমাজ ভেঙে যখন পরিবার ভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে তখনই নাকি শুরু হয় এই ব্যবসা। জীবিত অবস্থায় তার দেহের মাংস বিক্রি হয়, কতবার তার হিসেব নেই। বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ নারীর যৌনতাকে কেন্দ্র গড়ে তুলেছে সেক্স–ট্যুরিজমের মতো ব্যবসা। রেহাই পায় নি তার মাতৃত্বও। সারোগেটারি মাতৃত্ব এখন একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা। আবার কখনও শ্রমজীবী নারীকে কাজ হারাবার ভয়ে বিসর্জন দিতে হচ্ছে তার জরায়ু। পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর শোষনের চিত্র নানাবিধ।     

বিশ্বায়নের যুগে পুঁজির চলন হয়েছে অবাধ। তেমনই শিল্প-বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্যায়ে ল্যাপটপ আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে আজকের প্রজন্মের নারী ঘরে বসেই পা রাখছে বিশ্বের শ্রমবাজারে। উনবিংশ শতকের সমাজ সংস্কারের হাত ধরে যে নারী বাইরের কাজের দুনিয়ায় পা রেখেছিল তার সঙ্গে এই নতুন প্রজন্মের নারীর মননে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন প্রকাশ পাচ্ছে সামাজিক দ্বন্দ্বরূপে। ভারতীয় সমাজে যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ চোখে পড়ে শাবরীমালা বিতর্কে। কেরলের চিরকুমার ব্রহ্মচারী দেবতা আয়াপ্পার মন্দির শবরীমালাতে এতদিন ১০-৫০ বছরের নারীর অর্থাৎ প্রজননক্ষম নারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। এযাবৎকাল নারী এই নিষেধাজ্ঞা মেনে নিয়েছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ধর্ম তার রজঃস্বলা অবস্থাকে দূষিত, অপবিত্র ভাবতে বাধ্য করেছে, যা কিনা মনুষ্য প্রজাতির ধারাবাহিকতাকে অক্ষুন্ন রাখে। এই প্রজন্মের শিক্ষিত নারী তা আর মানতে রাজি নয়। সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালে আইন করে এই নিয়ম রদ করলেও সমাজে পিতৃতন্ত্র তথা প্রাচীনপন্থার সঙ্গে যুক্তিবাদের বিরোধ আজও চলছে। শিক্ষার হার শতকরা ১০০ শতাংশ যে রাজ্যে সেখানেও সমাজ ভাবনায় এই পিছুটান। অথচ ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলে, যেখানে এখনও আদিবাসী সমাজ অনেকাংশে অক্ষুন্ন আছে এবং পুঁজির দৌরাত্ম সেইভাবে থাবা বসাতে পারে নি, সেই অঞ্চলে কামরূপ কামাক্ষ্যায় অম্বুবাচীতে দেবীর রজঃস্বলারূপই পূজিত হয়। অর্থাৎ নারীর মাতৃরূপের উৎস এই সমাজে তার হিউমিলিয়েশানের কারণ হয় না। যদি খাশি, গারো ইত্যাদি উপজাতির সমাজ জীবন লক্ষ্য করা যায় তাহলে দেখব এখানে শ্রমবিভাজনে নারী আছে বাইরের শ্রমে, অর্থনীতির কেন্দ্রে। কিন্তু সেই সমাজে পুরুষ নিপীড়িত, অবদমিত এমন খবর আমার অন্তত জানা নেই। নারীর দ্বারা পুরুষের অবদমনের কোন কাহিনী অতীত সমাজের পুরান কথাতেও কখনও শোনা যায় না।

পরিশেষে

তাহলে এই প্রশ্ন খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে যে, সমাজ জীবনে এগিয়ে আসা, প্রাথাগত শিক্ষা, তথাকথিত স্বাধীনতা নারীর জীবনে কী অর্থ বহন করে? পুঁজির দ্বারা শোষিত হওয়ার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠা, নাকী পণ্যের বাজারে মূল্যবান হয়ে ওঠা!! ইতিহাস বলে যে,  অর্থনীতিতে পুঁজিবাদ যত বিকশিত হয়েছে সমাজ জীবনে পিতৃতান্ত্রিক প্রাধান্য তত বৃদ্ধি পেয়েছে। পুঁজির সাধনায় মানুষ কেবলই ধ্বস্ত করেছে প্রকৃতিকে, জল-জমি-জঙ্গল—সবের উপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে। মানুষ ভুলেই গেছে এই প্রকৃতির মালিক সে নয়, পরবর্তী প্রজন্মের হাতে সুস্থ প্রকৃতিকে তুলে দেওয়ায় তার বাঁচার শর্ত। সেই রকম পুরুষও সমাজে তার আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে ভুলেই যায় নারীর জীবন বিষাদগ্রস্ত হয়ে ওঠার অর্থ পরবর্তী প্রজন্মের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠা। সমগ্র জীবকূল, প্রতিটি অনুজীবানু, পাহাড়, সাগর, নদী নিয়ে গঠিত যে প্রকৃতি মানুষ তার অংশ মাত্র। সমাজ জীবনেও নারী পুরুষের সহনাগরিক। কোথাও কারও উপর কারও আধিপত্য বিস্তারের প্রশ্ন আসে না। প্রকৃতি ও নারীর পুনরুৎপাদনই এই জীব বৈচিত্র্যময় জগত সংসার এবং মানব সভ্যতার উৎস। তাই নারী ও প্রকৃতির সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার উপরেই নির্ভর করবে আগামীদিনে মানব প্রজাতির টিকে থাকা।।   

লেখক পরিচিতি:

বিজ্ঞানের ছাত্রী, গণিতে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেছেন এক দশকের উপর। বর্তমানে প্রবাসী এবং ইতিহাস ও সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে জানা বোঝায় আগ্রহী।

যোগাযোগ:

biswaspritilata2017@gmail.com

The post নারী: সেকাল, একাল, ভাবীকাল appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/society/women-past-present-future/feed/ 1 1756
মুখ ও মুখোশ https://pariprashna.in/article/society/face-and-mask/ https://pariprashna.in/article/society/face-and-mask/#comments Sat, 13 Mar 2021 17:22:03 +0000 https://pariprashna.in/?p=1585 সুপর্ণা দে চারিদিকে দেওয়াল লিখন ,ঝলমলে পোষ্টার –নারী শক্তির বিকাশ “বাংলা নিজের মেয়েকে চায়”। পিতৃতন্ত্রের শাসনে লিঙ্গ বৈষম্যের জগতে এ যেন এক বসন্ত বিকেলের রঙিন ছবি। বর্তমানে ভারতবর্ষের একটি মাত্র রাজ্যে মহিলা মুখ্যমন্ত্রী আর ঝলমলে বিজ্ঞাপনে , নারীশক্তির বন্দণা । এ রকম সময়ে একজন সংস্কৃতিমনস্ক কেন্দ্রিয়মন্ত্রী  তাঁর সংস্কৃতিক চেতনার হাত ধরে বলেছেন “মেয়েরা পরের ধন,বিদায় […]

The post মুখ ও মুখোশ appeared first on Pariprashna.

]]>
সুপর্ণা দে

চারিদিকে দেওয়াল লিখন ,ঝলমলে পোষ্টার –নারী শক্তির বিকাশ “বাংলা নিজের মেয়েকে চায়”। পিতৃতন্ত্রের শাসনে লিঙ্গ বৈষম্যের জগতে এ যেন এক বসন্ত বিকেলের রঙিন ছবি। বর্তমানে ভারতবর্ষের একটি মাত্র রাজ্যে মহিলা মুখ্যমন্ত্রী আর ঝলমলে বিজ্ঞাপনে , নারীশক্তির বন্দণা । এ রকম সময়ে একজন সংস্কৃতিমনস্ক কেন্দ্রিয়মন্ত্রী  তাঁর সংস্কৃতিক চেতনার হাত ধরে বলেছেন “মেয়েরা পরের ধন,বিদায় করে দেবো “- দেশের রুচিশীল জনগনের কাছে প্রশ্ন কেন এই কুরুচিকর রাজনৈতিক খেলা । একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে  যদি এরকম কুরূচিসম্পন্ন মন্তব্য শুনতে হয় তাহলে এদেশের সাধারণ মেয়েদের সম্মান কোথায় ?

 “বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও” শ্লোগানধারীদের এ রকম কুরুচিসম্পন্ন মন্তব্যের পেছনে রয়েছে ভোটের যুদ্ধে গদি দখলের লড়াইয়ের নোংরা রাজনৈতিক খেলা । গদি দখলের যুদ্ধে মিডিয়াকে হাতের মুঠোয় এনে নারীকে দাঁড় করানো হয়েছে মহাভারতের যুদ্ধের মতো শিখন্ডীর জায়গায় । নারীত্বকে ঢাল করে যুদ্ধের আসর সাজানো হয়েছে , কতখানি অপমান , কতখানি লজ্জ্বার । রাজনৈতিক মতাদর্শকে সরিয়ে রেখে ভাবুনতো একজন নারী যখন রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরুষের সাথে লড়াই করছে তখন আধুনিক সংস্কারমুক্ত ধ্যানধারণাকে বিসর্জন দিয়ে বলা হচ্ছে —মেয়েরা পরের সম্পদ, বিদায় করে দেব । মেয়েদের সম্পত্তির সাথে তুলনা করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে মহামান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মহাশয়।

  ভারত একটি বহুত্ববাদী দেশ । ভারতের বৃহত্তর সমাজে যে সব বিশ্বাস ও চিন্তন বদ্ধমূল হয়ে আছে তার মধ্যে মনুস্মৃতির ধারাবাহিকতা ভীষণভাবে বিদ্যমান । হিন্দুত্ববাদের অন্যতম ধারকগন নারীকে পণ্য ও সম্পত্তির বেশি কিছু ভাবতেই পারেন না। তাদের পুরুষসত্ত্বা নারীকে চিরকাল দ্বিতীয় সারিতে ঠেলে দেয় , লাঞ্ছিত –অপমানিত করে । পিতৃতন্ত্র নারীকে রাখতে চায় পুরুষের অধীনে , শিক্ষা ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে । একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে এই ভয়ঙ্কর লিঙ্গ বৈষম্য মনু্স্মৃতির ধারাবাহিকতাকে শিরোধার্য করে আজও আমাদের সমাজে টিকে আছে। পিতৃতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা সেই সম্পত্তির মিথ্যা সম্মানদান ও নোংরা রাজনৈতিক খেলায় প্রতিনিয়ত সম্মানের চেয়ে অসম্মানই করে চলেছেন –মুখোশের আড়ালে হিংস্র মুখগুলি বরবার জেগে ওঠে। উগ্র ব্রাহ্মণত্ববাদ ও নারীবিদ্বেষী সমাজ প্রতিনিয়ত নারীকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারে । একটা বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে আছে  কেন্দ্রিয় মন্ত্রীমহাশয়ের চিন্তনে –যে নারী দূ্র্বল , নারী পণ্য ।

লিঙ্গবৈষম্যের দেশে ,নারী সম্বন্ধে এরকম কুৎসিত মন্তব্যকারীরা সিংঘু টিকরি সীমান্তে মহিলাদের হাতে যখন স্টিয়ারিংয়ের ছবি দেখে তখন , গেল! গেল! বলে গর্জে ওঠে । যে মাটিতে মেয়েদের জন্মাতে পারাটুকুকে নিশ্চিত করতে আইন করতে হয় সেই মাটিতে খোলা আকাশের নীচে কৃষকের পরিচয়ে অগুনতিক মহিলার দাপিয়ে বেড়ানোটাকে মেনে নিতে পারেনি। অন্তঃসারশূণ্য দাম্ভিক রাষ্ট্র জানতে চায়- মহিলাদের লড়াইয়ের ময়দানে রাখা হয়েছে।

কলকাতায় প্রতিবাদ
কলকাতায় নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আলজাজিরা থেকে রয়টারের [Reuters] ছবি

কেন ? নিজেদের ভয় পাওয়া চেহারাটা ঢাকতে  পিতৃকূল বিনয়ের সাথে জানতে চায়  – নারীরা ওখানে কেন ? প্রতি নিয়ত যাদের যৌন নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়, যাদের দিকে অ্যাসিড ছুঁড়ে দেওয়া হয়, যাদের দুবেলা মার খেতে খেতে বাঁচতে হয়, সমাজের দুই তৃতীয়াংশ কাজ করেও এক তৃতীয়াংশ অধিকার যাদের প্রতিষ্ঠা পায়নি এ যাবৎকাল পর্যন্ত–তারা সবসময় অনুগ্রহের পাত্র ,দূ্র্বল ,পণ্য। ট্রাক্টর চালিয়ে লিঙ্গবিভেদকে চুলোয় পাঠিয়ে মেয়েরা যখন চাষীর পরিচয়ে , জমির অধিকারে গর্জে ওঠে, তখন মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের মনে প্রশ্ন জগে- নারীরা ওখানে কেন ? প্রতিদিনের এই ঘটনাগুলি খালি চোখে বিশ্লেষণ না করে একটু মানবিক হোন ।

আসলে আপনাদের চিন্তার গভীরে , মুখোশের আড়ালে , মননে – ঘুনপোকার মতো বাসা বেঁধে আছে – নারী পণ্য, নারী সম্পত্তি, নারী commodity । পিতৃতন্ত্র নানাভাবে মেয়েদের second sex করে রেখেছে। আসলকথা হল বর্তমানে সংসদীয় রাজনীতিতে নারী প্রচারের মাধ্যম I ’বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও ‘ শ্লোগানধারীরা  মেয়েদের যদি এতটা সম্মানীয় স্থানে রাখে তাহলে কৃষক আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার জন্য পরিবেশকর্মী দিশা রবিকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করা হল কেন ? আর কতদিন পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার দলিলকে শিরোধার্য করে আমরা নিজেদের অপমানিত করব । আর কতদিন কোন রায় ,কোন আইনকে প্রমান করতে হবে নারীরা কারোর সম্পত্তি নয় । আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের আড়ালে লুকিয়ে আছে লিঙ্গ বৈষম্যের চোরাবালি , নারীবিদ্বেষ, পিতৃতন্ত্রের অলিখিত কদর্য দলিল ।

কৃষক আন্দোলন
কৃষক আন্দোলনে নারীরা (ছবি : মিন্ট)

ভোটের বাজারে ঝলমলে বিজ্ঞাপন আছে , তীর্যক মন্তব্য আছে – নিরাপত্তা নেই। নারীবিদ্বেষ, লিঙ্গবৈষম্য ,পুরুষের লালসা, পিতৃতন্ত্রের সুচতুর উৎকন্ঠায় মানুষ হিসাবে নারীর স্বীকৃতি প্রদীপের তলার অন্ধকারের মতো। উত্তরপ্রদেশের হাথরাসের ১৯ বছরের তরুনী কেন লাঞ্চিত ও নির্যাতিত হয়েছিল । কেন সরকার দলিত নির্যাতিতার পাশে না থেকে উচচ বর্ণের নির্যাতনকারীদের সাহায্য করেছিল । যোগী প্রশাসন অত্যাচারীকে আড়াল করতে বলেছিল- প্রতিবাদকারীদের জীভ কেটে নেওয়া হবে , তাদের ওপর যৌন নির্যাতন করা হবে । এই যোগী সরকারই কিছুদিন আগে বাংলার মাটিতে এসে নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন , বলেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে নারীরা নিরাপদ নয়। ধর্ষণ ও ধর্ষণের হুমকি দেওয়া যাদের স্বভাবজাত তারাইতো মেয়েদের কে পণ্য- সম্পত্তি বলতে পারে। শুধুমাত্র মেয়েরা নয় , লিঙ্গবৈষম্যের এই ঘৃণ্য রাজনৈতিক খেলা দলিতবিরোধী, নিম্নবিত্ত শ্রেণী বিরোধী- যোগীরাজ্য তার প্রমাণ। উত্তরপ্রদেশে ধর্ষণে অভিযুক্তকারীদের

(জামিনে ছাড়া পেয়ে) হাতে নির্যাতিতার বাবা খুন হয় ।গতকাল ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করে মেডিকেল পরীক্ষা করাতে চাওয়ার জন্য নির্যাতিতার বাবাকে ট্রাক ধাক্কা মারে,লোকটি মারা যায় । এখনই সময় মুখোশের আড়ালের মুখগুলিকে ভালো করে চিনে নেওয়ার।

লেখক পরিচিতি:

লোক সংস্কৃতির গবেষক, পরিবেশ কর্মী ও নাট্যকর্মী।

মেইল আই ডি:  suparnadey2010@gmail.com

The post মুখ ও মুখোশ appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/society/face-and-mask/feed/ 4 1585
ইকোফেমিনিসম—নারী, প্রকৃতি ও সমকাল https://pariprashna.in/article/art-and-literature/ecofeminism-women-nature-and-the-contemporary/ https://pariprashna.in/article/art-and-literature/ecofeminism-women-nature-and-the-contemporary/#comments Fri, 02 Oct 2020 06:31:54 +0000 https://pariprashna.in/?p=999 শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য জল আলো বাতাস মাটি এমন আরও অনেক কিছুর সম্মেলনে যেভাবে একটি বীজ আস্তে আস্তে বনস্পতি হয়ে ওঠে ঠিক তেমনই একটি ভ্রূণ মাতৃজঠরে প্রত্যহ তিলে তিলে স্ফীত হয়ে পূর্নাঙ্গ শিশুর চেহারা নেয়। নারীর শরীরেই যেন প্রকৃতির প্রতিফলন, প্রকৃতির মতোই সে প্রাণের প্রতিপালক। এই অর্থে নারীর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক অনন্যসাধারণ। নারী ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে […]

The post ইকোফেমিনিসম—নারী, প্রকৃতি ও সমকাল appeared first on Pariprashna.

]]>
শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য

জল আলো বাতাস মাটি এমন আরও অনেক কিছুর সম্মেলনে যেভাবে একটি বীজ আস্তে আস্তে বনস্পতি হয়ে ওঠে ঠিক তেমনই একটি ভ্রূণ মাতৃজঠরে প্রত্যহ তিলে তিলে স্ফীত হয়ে পূর্নাঙ্গ শিশুর চেহারা নেয়। নারীর শরীরেই যেন প্রকৃতির প্রতিফলন, প্রকৃতির মতোই সে প্রাণের প্রতিপালক। এই অর্থে নারীর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক অনন্যসাধারণ। নারী ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে এক মহৎ সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে। জন্ম হয় নারীবাদের এক নতুন ধারার। নাম ইকোফেমিনিসম। বাংলা করলে দাঁড়ায় পরিবেশ নারীবাদ।

ইকোফেমিনিসম ও ইকোক্রিটিসিজমের আলোয় শকুন্তলা

 ফরাসি নারীবাদী লেখক ফ্রাসোয়াঁ দ্যুবন (Françoise d’Eaubonne) ১৯৭৪ সালে প্রথম ইকোফেমিনিস্ম শব্দটি তার Le Féminisme ou la Mort (নারীবাদ নাকি মৃত্যু) গ্রন্থে ব্যবহার করেন। এই বইটির মূল উপজীব্য মূলত নারীর  ও প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য বিষয়ক মতবাদ। প্রকৃতির সঙ্গে নারীর একাত্মতা ও ঘনিষ্ঠতা পরিবেশ মূল্যায়নের অন্যতম এক দিক। নারীর ওপর পুরুষের ও প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য বিস্তারের মধ্যে যে যোগসূত্র  তা এই মতবাদকে সামনে আনলে স্পষ্ট ফুটে ওঠে। সৃষ্টির একেবারে প্রথম থেকেই নারীরা প্রকৃতির সঙ্গে  ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে বলেই ইকোফেমিনিসমের জন্ম।অথচ পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর সঙ্গে প্রকৃতির এই আকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কটিই বিপর্যস্ত। প্রকৃতি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতির জায়গায় প্রশ্রয় পেয়ে এসেছে এক পণ্য-কেন্দ্রিক ফেটিশ (fetish) সংস্কৃতি। এর ঘেরাটোপে  নারী, শিশু, দরিদ্র, বর্ণবৈষম্যের শিকার মানবগোষ্ঠী ইত্যাদির  মতোই প্রাকৃতিক নানান  উপাদান যেমন, বায়ুমণ্ডল, স্থলভাগ, জলসম্পদ এবং প্রাণীজগৎ অবদমিত ও শোষিত  হয়ে চলেছে । ইকোফেমিনিস্টদের মতে এই প্রকৃতিবিমুখ অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হল পরিবেশ নারীবাদ। এই মতবাদের যথাযথ প্রয়োগেই পরিবেশ সংরক্ষণ ঘটানো সম্ভব হবে।  নারীর মন মমতায় পরিপূর্ণ। আন্তরিক যত্ন ও তন্নিষ্ঠ লালনের কথা উঠলে পুরুষ নয়, নারীর কথাই আমাদের মনে আসে। নারীর এই গুণেই সমাজ সঠিক পথে পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি যত্নবান হবে। নারী যেমন নিজের সংসারকে স্নেহ, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা দিয়ে আগলে রাখে, সেভাবেই  প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

Ecofeminism

এই পরিপ্রেক্ষিতেই সমকালীন সাহিত্যে এক নতুন তত্ত্বের জন্ম হয়। ১৯৭৮ সালে উইলিয়াম রুখার্ট সেই তত্ত্বের নাম দেন ইকোক্রিটিসিজম। প্রকৃতির প্রতি গাঢ় অন্তরঙ্গতা, মানুষ ও প্রকৃতির  নিবিড় সম্পর্ক সম্বন্ধে সচেতনতাই হল ইকোক্রিটিসিজমের মূল কথা। চেরিল গ্লটফেল্টির মতে নদ-নদী-মরুভূমি-পর্বত-শহর-প্রযুক্তি-মানবশরীর-সংস্কৃতি সব কিছুই এর অর্ন্তগত। ইকোক্রিটিকরা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য বিশেষ করে কালিদাসের শকুন্তলা নাটকটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কালিদাস বলতে চেয়েছেন মানুষ প্রকৃতির কাছাকাছি  যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ সে সুখে থাকে, প্রকৃতিবিযুক্ত হলে তার মানসিক সংকট সৃষ্টি হয়। কণ্বের তপোবনে মানুষ আর মানবেতর প্রাণীরা নির্বিবাদে বাস করে। অন্যদিকে  রাজা দুষ্মন্ত অরণ্যের কেউ নন। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্বেচ্ছাচারিতার আনন্দে এক হরিণের দিকে তির নিক্ষেপ করতে গেলে তপস্বী তাঁকে  বলেন: মহারাজ, আশ্রমমৃগ বধ করবেন না—রবীন্দ্রনাথের ভাষায়: মৃদু এ মৃগদেহে মেরো না শর/ আগুন দেবে কেহে ফুলের পর। কতদিন আগের তপস্বীর এই কাতর অনুরোধ ইকোফেনিস্ট, ইকোক্রিটিক তো বটেই, তাছাড়াও সমগ্র পরিবেশসচেতন মানুষের মনের গভীরতম অঞ্চলের কথা। মানবেতর প্রাণীরাও যে কোনও না কোনওভাবে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে সে কথা সকল মানুষের মনে গেঁথে যাওয়া উচিত। দুষ্মন্তের আচরণ এবং পরবর্তীকালে শকুন্তলাকে প্রত্যাখ্যানের মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন প্রতিফলিত হয় প্রকৃতির ওপর তাঁর খবরদারির উল্লাস এবং  এই উল্লাসের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে তাঁর পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা। কণ্ব শকুন্তলাকে পতিগৃহে পাঠানোর সময় তপোবন তরুদের সম্বোধন করে বলেন, হে সন্নিহিত তরুগণ! যিনি তোমাদের জলসেচন না করে কদাচ জলপান করতেন না, ভূষণপ্রিয়া হয়েও কদাচ যিনি তোমাদের পল্লবভঙ্গ করতেন না, তোমাদের কুসুমপ্রসবের সময় উপস্থিত হলে যাঁর আনন্দের সীমা থাকত না, সেই শকুন্তলা আজ পতিগৃহে যাচ্ছেন, তোমরা সকলে অনুমোদন করো। এই উক্তি থেকে শকুন্তলার সঙ্গে অরণ্য ও বৃক্ষলতার অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক স্পষ্ট ফুটে ওঠে।দেখা যায় যে ন্যাচারাল হ্যাবিটাট (Natural habitat) ছেড়ে দুষ্মন্তের রাজসভায় আসায় শকুন্তলা বিচ্ছিন্নতা বোধ করছেন, অস্থির হয়ে উঠছেন। প্রকৃতি বিচ্ছিন্ন শকুন্তলার এই যন্ত্রণা আজকের জলবায়ু সঙ্কটের কবলে পড়া সকল মানুষের বিপন্নতার সঙ্গে যেন এক হয়ে যায়।  শকুন্তলা ফিরে আসেন প্রকৃতির মধ্যে। শান্ত হয় তাঁর মন। এই আশ্রমেই দুষ্মন্তের সঙ্গে তাঁর পুর্নমিলন হয়। এই মিলন নিছক নরনারীর মিলন নয়, বস্তুত তাঁদের আকাঙ্ক্ষার সমলয়ন, নারী পুরুষের মধ্যের প্রাকৃতিক সম্পর্কের পুনরুদ্ধার, প্রকৃতির কোলে তাঁদের  পুনরুজ্জীবনকেই বোঝায়।

ইকোফেমিনিসম ও বস্তুবাদ

প্রসঙ্গত ইগালিটারিয়ান কম্যুনিজমের সমালোচনা করে নারী পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে কার্ল মার্কসের বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মার্কসের কথায়,  “ From the character of this relationship follows how much man as a species-being, as man, has come to be himself and to comprehend himself; the relation of man to woman is the most natural relation of human being to human being. It therefore reveals the extent to which man’s natural  behaviour has become human, or the extent to which the human essence in him has become a natural  essence—the extent to which his human nature has come to be natural  to him”। মানবিক সম্পর্কগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক সম্পর্কটির গভীরে পৌঁছে আমরা দেখি যে আগামী প্রজন্মকে জন্ম দেওয়া ও গড়ে তোলার ক্ষেত্রে  পুরুষের ভূমিকা শুধুমাত্র শুক্রাণু দ্বারা ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করা। তারপরেই প্রকৃতি দখল নেয় হবু সন্তান ও মায়ের শরীরের এই সৃষ্টিকে সুরক্ষিত রাখতে। মাতৃজঠর হয়ে ওঠে  জটিল এক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার পবিত্র আধার। কোটি কোটি মাইক্রোবস (microbes)  বাইরে থেকে মাতৃগর্ভে প্রবেশ করে নিষিক্ত ডিম্বাণুকে ঘিরে ফেলে। এরা সমস্ত ক্ষতিকারক জীবাণুর থেকে আগলে রাখে ডিম্বাণুকে। এই সময়ে নারীকে প্রকৃতির থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার চেয়ে জঘন্য কাজ আর বুঝি কিছু হয় না। পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক পরিবেশে গর্ভাবস্থায় নারীকে এমনই সব শারীরিক ও মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় যা প্রকৃতি অনুমোদন করে না।। শ্রেণির তারতম্যে এই অপব্যবহারের চরিত্র আলাদা হলেও নারীকে শোষনের শিকার হতেই হয়। জন্ম নেয় অবিকশিত রোগসম্পন্ন শিশুর।

বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইকোফেমিনিস্ট ক্যারোলাইন মারচেন্ট(Carolyn Merchant) যথার্থই বলেছেন, “Social ecofeminism advocates the liberation of women through overturning economic and social hierarchies that turn all aspects of life into a market society that today even invades the womb”.

এখান থেকেই প্রমাণ হয় সন্তানের সঙ্গে নারীর ও প্রকৃতির গভীর যোগাযোগ। শুধু তাই নয় সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার আগেই মাতৃ স্তনে মাইক্রোবস বাসা বাধে, যাতে ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্তন পানের মাধ্যমে শিশুর অন্ত্রে এই গাট মাইক্রোবায়োটা(gut microbiota)  দুধের আগে পৌঁছে যায়। পরে এই গাট মাইক্রোবায়োটা অন্ত্রের সঙ্গে শিশুর মস্তিষ্কের যোগসূত্র ঘটায় ভেগাস স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে। অথচ এই সময়ে মায়ের দুধের সঙ্গে শিশুর পেটে জায়গা করে নিচ্ছে প্লাস্টিকের আণুবীক্ষণিক কণা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্নায়ুর স্বাভাবিক প্রকৃতিজাত কার্যকলাপ। আমরা কিন্তু জানতেই পারছি না। পুঁজিবাদ ও পিতৃতন্ত্রের যোগসাজশ এই অপ্রিয় সত্যকে আড়ালে রেখে দেয় লুমপেন ফেটিশ সংস্কৃতির কৃত্রিম আলোর মোড়কে।

পুঁজিবাদকে যে কোনও মূল্যে টিকিয়ে রাখতে প্রাকৃতিক সম্পদের লাগামছাড়া ব্যবহারের হালের অভূতপূর্ব নারকীয় উল্লাসের খেসারত দিতে হচ্ছে পৃথিবীকে। করোনাকালে লবেজান মানুষের আকুতি অলিতে গলিতে। প্রকৃতির প্রত্যাঘাত এমনই হয়। অন্যদিকে হলিউডের পিতৃতান্ত্রিক পরিবেশকে চ্যালেঞ্জ করেছেন সেখানকার নারীরা। মিটু আন্দোলন থেকে হালের সবরিমালা প্রতিবাদ নারীদের তরফ থেকেই এক প্রত্যাঘাত। প্রকৃতি ও নারীর ওপর ব্যাক্তিগত মালিকানা কায়েম করে  নিপীড়ন যেন সমার্থক হয়ে উঠছে।

 ইকোফেমিনিসমের ভিত্তি হিসেবে প্রকৃতির ওপর মানুষের এই নিপীড়ন ও তার সঙ্গে নারীর ওপর পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যের যে সাজুয্য তা আজকের জলবায়ু সঙ্কটের নিরিখে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। এই সাযুজ্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃতি ও নারী-পুরুষ সম্পর্কের প্রাকৃতিক দিকটির পুনরুদ্ধারের মধ্যেও। সুস্থ জীবন বজায় রাখতে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিরন্তর কথোপকথন এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতে নারী-পুরুষ আকাঙ্ক্ষার সমলয়নের মধ্যেও দেখা যায় এই সাযুজ্য। সমকালীন প্রেক্ষাপটে নারী ও প্রকৃতিকে তাদের আকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠা করতে ইকোফেমিনিসম এক মজবুত হাতিয়ার।

তথ্যসূত্র  :

১. Economic and Philosophic Manuscripts of 1844, Karl Marx, Aakar Books Classics, 2016

২. Merchant, Carolyn (2005). “Ecofeminism”. Radical Ecology. Routledge. pp. 193–221.


লেখক পরিচিতি

লেখক পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। ছোটগল্পের পাশাপাশি সমাজ ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লিখে থাকেন।
মেইল আই ডি- bhattacharya.sankhadeep@gmail.com

The post ইকোফেমিনিসম—নারী, প্রকৃতি ও সমকাল appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/art-and-literature/ecofeminism-women-nature-and-the-contemporary/feed/ 1 999