পুঁজিবাদ Archives - Pariprashna https://pariprashna.in/tag/পুঁজিবাদ/ Sat, 04 Apr 2026 12:14:35 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=7.1 https://i0.wp.com/pariprashna.in/wp-content/uploads/2018/03/cropped-pariprashna-Logo-1-2.jpg?fit=32%2C32&ssl=1 পুঁজিবাদ Archives - Pariprashna https://pariprashna.in/tag/পুঁজিবাদ/ 32 32 182578982 প্রকৃতি যখন অদৃশ্য, মুনাফা তখন দৃশ্যমান: সবুজ মিথ্যার রাজনৈতিক অর্থনীতি https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/when-nature-is-invisible-profit-is-visible-the-political-economy-of-green-lies/ https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/when-nature-is-invisible-profit-is-visible-the-political-economy-of-green-lies/#respond Sat, 04 Apr 2026 12:14:26 +0000 https://pariprashna.in/?p=3318 পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে উৎপাদনের হিসাব রাখা হয়—কত পুঁজি লাগলো, কত শ্রম লাগলো, কত লাভ হলো। কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না—এই উৎপাদনের ফলে কতটা মাটি মারা পড়লো, কতটা জল বিষাক্ত হলো, কতটা বাতাস শ্বাস নেওয়ার অযোগ্য হয়ে উঠলো।

The post প্রকৃতি যখন অদৃশ্য, মুনাফা তখন দৃশ্যমান: সবুজ মিথ্যার রাজনৈতিক অর্থনীতি appeared first on Pariprashna.

]]>
বঙ্কিম দত্ত

পুঁজিবাদ আমাদের শেখায়—যার দাম নেই, তার কোনো মূল্য নেই। এই একবাক্যের দর্শনই আজকের পরিবেশ বিপর্যয়ের গভীরতম তত্ত্ব। জল, মাটি, বাতাস, বন—যেগুলি ছাড়া মানুষের জীবন, শ্রম ও সভ্যতা অসম্ভব—সেগুলিই পুঁজিবাদী দৃষ্টিতে সবচেয়ে “সস্তা”, কারণ সেগুলির কোনো বাজারদর নেই। আর সস্তা বলেই সেসব  লুটযোগ্য। লুটযোগ্য বলেই সেগুলি অদৃশ্য। এটাই  হ’লো প্রাকৃতিক মূল্যের অদৃশ্যকরণ।

পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে উৎপাদনের হিসাব রাখা হয়—কত পুঁজি লাগলো, কত শ্রম লাগলো, কত লাভ হলো। কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না—এই উৎপাদনের ফলে কতটা মাটি মারা পড়লো, কতটা জল বিষাক্ত হলো, কতটা বাতাস শ্বাস নেওয়ার অযোগ্য হয়ে উঠলো। প্রকৃতির অবদান ও ক্ষতি—দুটোই এক্ষেত্রে হিসাবের বাইরে। এই “বাইরে রাখা” কোনো প্রযুক্তিগত  সীমাবদ্ধতা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

কারণ প্রকৃতির প্রকৃত মূল্য যদি দৃশ্যমান হয়, তবে মুনাফার হিসাব ভেঙে পড়বে। আর এই অদৃশ্যকরণ কোনো দুর্ঘটনাও নয়। এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল।তাই কর্পোরেট ব্যালান্স শিটে লাভের অঙ্ক থাকে, কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না—এই লাভের জন্য কতটা ভবিষ্যৎ চুরি হলো। প্রকৃতি ধ্বংস এখানে অপরাধ নয়; এটি হিসাবের বাইরে রাখা “খরচ”।

এই অদৃশ্যকরণ শুধু সংখ্যার মাধ্যমে নয়, ভাষার মাধ্যমেও ঘটে। বনকে বলা হয় “ফরেস্ট রিসোর্স”, নদীকে “ওয়াটার রিসোর্স”, পাহাড়কে “মিনারেল বেল্ট”। জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র পরিণত হয় কাঁচামালের ভাণ্ডারে, সম্বল হয়ে ওঠে  সম্পদ। পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে “রিসোর্স” বলে ডাকে। এই শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সহিংসতা। বন আর জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র নয়—সে কাঠ। নদী আর সামাজিক-প্রাকৃতিক জীবনরেখা নয়—সে জলসম্পদ। পাহাড় আর ভূদৃশ্য নয়—সে খনিজ ভাণ্ডার। ভাষার এই রূপান্তরেই প্রকৃতির জীবনমূল্য মুছে যায়, সামনে আসে কেবল ব্যবহারযোগ্যতা। এই ভাষা নিরীহ নয়—এটি শোষণের পূর্বশর্ত। যে জীবন্ত, তাকে হত্যা করতে হলে আগে তাকে প্রাণহীন বস্তুতে নামাতে হয়। প্রাকৃতিক মূল্য অদৃশ্য হলে—মানুষ বুঝতে পারে না তার জীবন কোন শর্তের ওপর দাঁড়িয়ে। 

উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের সংযোগ ভেঙে যায়। এটাই মেটাবলিক রিফ্ট। মানুষ তখন এমন এক সমাজ গড়ে তোলে যা নিজের  অস্তিত্বের শর্ত ধ্বংস করেই টিকে থাকতে চায়।

বাস্তুসমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিতে প্রশ্নটা পরিষ্কার—আমরা কি প্রকৃতিকে বাঁচাতে চাই, না কি তার ধ্বংসকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করতে চাই? প্রকৃতির মূল্য মানে তার দাম নয়। প্রকৃতির মূল্য মানে তার অস্তিত্বের শর্ত, মানুষের জীবনের ভিত্তি।

এরপর আসে সবুজ মুখোশ। পরিবেশ ধ্বংসের এই যুগে পুঁজিবাদ বুঝেছে—খোলাখুলি লুট করলে রাজনৈতিক বৈধতা পাওয়া যাবে না। তাই সে নতুন ভাষা শিখেছে: কার্বন ক্রেডিট, নেট-জিরো, ESG, গ্রিন গ্রোথ। এখানে প্রকৃতি আর জীবনশর্ত নয়; সে হয়ে ওঠে পরিমাপযোগ্য ইউনিট। একটি বন মানে আর মানুষ, প্রাণী ও মাটির সহাবস্থান নয়  বরং কত টন কার্বন শোষণ।

এই কার্বন শোষণ আবার কর্পোরেট দূষণের লাইসেন্স জোগায়।

একদিকে কর্পোরেট সংস্থা দূষণ চালায়, অন্যদিকে গ্লোবাল সাউথের কোনো প্রান্তে একটি বন দখল করে “অফসেট” করে। স্থানীয় মানুষ উৎখাত হয়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, কিন্তু কর্পোরেট রিপোর্টে লেখা থাকে—“environmentally responsible”। প্রকৃতির বাস্তব মূল্য অদৃশ্য; দৃশ্যমান শুধু বাজারযোগ্য সার্টিফিকেট।

এই ব্যবস্থায় পরিবেশ সংকট আর রাজনৈতিক প্রশ্ন থাকে না। তা হয়ে ওঠে ম্যানেজমেন্টের সমস্যা, ফিন্যান্সের সুযোগ, নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র। প্রকৃতি রক্ষা তখন সংগ্রাম নয়, প্রজেক্ট। নাগরিক প্রতিবাদ নয়, কনসালটেন্সি।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই অদৃশ্যকরণ মানুষের চেতনাকেও বিকৃত করে। আমরা ভাবতে শুরু করি, দাম বাড়লেই প্রকৃতি বাঁচবে, সবুজ পণ্য কিনলেই দায়িত্ব শেষ। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—এই ব্যবস্থাকে “সমাধান” হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাজারই প্রকৃতি বাঁচাবে। অথচ বাজারই সেই কাঠামো, যা প্রকৃতিকে অদৃশ্য করেছে। এটি এমনই যেন আগুনকে দিয়ে আগুন নেভানোর দাবি। আমরা ভুলে যাই—বাজারই সেই কাঠামো, যা প্রকৃতিকে অদৃশ্য করে রেখেছে।

বাস্তুসমাজতান্ত্রিক রাজনীতি এখানেই হস্তক্ষেপ করে। সে বলে—প্রকৃতির মূল্য কোনো বাজারদর নয়। বাস্তুসমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিতে প্রশ্নটা পরিষ্কার—আমরা কি প্রকৃতিকে বাঁচাতে চাই, না কি তার ধ্বংসকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করতে চাই? প্রকৃতির মূল্য মানে তার দাম নয়। প্রকৃতির মূল্য মানে তার অস্তিত্বের শর্ত, মানুষের জীবনের ভিত্তি। প্রকৃতির মূল্য তার জীবনধারণমূলক ভূমিকা, তার পুনরুৎপাদন ক্ষমতা, তার সঙ্গে মানুষের বিপাকীয় সম্পর্ক। এই মূল্যকে দৃশ্যমান করা মানে—পুঁজিবাদী হিসাব ভাঙা, সবুজ মিথ্যা উন্মোচন করা এবং প্রকৃতিকে আবার রাজনৈতিক প্রশ্নে ফিরিয়ে আনা।

পরিবেশ সংকটের মূলে প্রকৃতির অভাব নেই, অভাব আছে পরিবেশের স্বীকৃতির।

বাস্তুসমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিতে প্রশ্নটা পরিষ্কার—আমরা কি প্রকৃতিকে বাঁচাতে চাই, না কি তার ধ্বংসকে আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করতে চাই? প্রকৃতির মূল্য মানে তার দাম নয়। প্রকৃতির মূল্য মানে তার অস্তিত্বের শর্ত, মানুষের জীবনের ভিত্তি। প্রকৃতিকে আবার দৃশ্যমান করতে হবে—শ্রমের সহচর, সমাজের ভিত্তি এবং ভবিষ্যতের শর্ত হিসেবে।

সবুজ মুখোশ খুলে ফেলতেই হবে। যতদিন প্রকৃতি কেবল বাজারে ধরা পড়বে, জীবনে নয়—ততদিন সবুজ উন্নয়ন কথাটি পুঁজিবাদের সবচেয়ে সফল মিথ্যাই থেকে যাবে। আর প্রকৃতি অদৃশ্য থাকলে, ধ্বংসই একমাত্র দৃশ্যমান বাস্তবতা হয়ে ওঠে। প্রশ্নটা তাই আর শুধু পরিবেশ রক্ষার নয়—প্রশ্নটা হলো, কোন সমাজব্যবস্থায় প্রকৃতি দৃশ্যমান থাকবে:

মুনাফার সমাজে, না  সমতার সমাজে?

The post প্রকৃতি যখন অদৃশ্য, মুনাফা তখন দৃশ্যমান: সবুজ মিথ্যার রাজনৈতিক অর্থনীতি appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/when-nature-is-invisible-profit-is-visible-the-political-economy-of-green-lies/feed/ 0 3318
ইরানের ওপর মার্কিন যুদ্ধ মোদির ভারতের বৈদেশিক নীতির শূন্যতা উন্মোচন করেছে https://pariprashna.in/article/society/iran-us-war-exposes-gap-in-modis-foreign-policy/ https://pariprashna.in/article/society/iran-us-war-exposes-gap-in-modis-foreign-policy/#respond Sun, 15 Mar 2026 16:47:49 +0000 https://pariprashna.in/?p=3312 মাত্র কয়েকদিন আগে, জাহাজটি ভারতের প্রধান বহুজাতিক নৌ মহড়ায় আমন্ত্রিত অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিশাখাপত্তনমে নোঙর করেছিল। জাহাজটি আনুষ্ঠানিক নানা  কাজে অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে ভারতের রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে একটি কুচকাওয়াজও ছিল।

The post ইরানের ওপর মার্কিন যুদ্ধ মোদির ভারতের বৈদেশিক নীতির শূন্যতা উন্মোচন করেছে appeared first on Pariprashna.

]]>
বোদাপাটি শ্রুজন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনি এবং আরও শত শত লোককে হত্যার দুই দিন পরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা চালায়। এতে ১৬০ জনেরও বেশি শিশু নিহত হয়  ও একটি মার্কিন সাবমেরিন ভারত মহাসাগরে ইরানি যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনাকে টর্পেডো নিক্ষেপ করে ডুবিয়ে দেয়। জাহাজটি ভারতে আয়োজিত বহুজাতিক নৌ মহড়ায় অংশ নেওয়ার পরে  ফিরছিল।

মাত্র কয়েকদিন আগে, জাহাজটি ভারতের প্রধান বহুজাতিক নৌ মহড়ায় আমন্ত্রিত অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিশাখাপত্তনমে নোঙর করেছিল। জাহাজটি আনুষ্ঠানিক নানা  কাজে অংশ নিয়েছিল, যার মধ্যে ভারতের রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে একটি কুচকাওয়াজও ছিল।

কিন্তু এই অঞ্চল ত্যাগ করার অল্প সময়ের মধ্যেই, শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের কাছে, গল বন্দর থেকে প্রায় বিশ নটিক্যাল মাইল দূরে, একটি মার্কিন পারমাণবিক সাবমেরিন থেকে নিক্ষিপ্ত টর্পেডোতে ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ধ্বংস হয়ে যায়। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী উদ্ধার অভিযান শুরু করে এবং ৩২ জন নাবিককে সমুদ্র থেকে তুলে আনে। প্রায় ১৬০ জন ক্রু সদস্য সমুদ্রে মারা যান।

জাহাজটি এবং এর ক্রু, মাত্র কয়েকদিন আগেই  যাদের  ভারতীয় নৌবাহিনীর অতিথি হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছিল। তারা ভারতের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠান এবং সামরিক মতবিনিময়ে অংশগ্রহণ করেছিল। তবুও, নিরস্ত্র জাহাজটি এই অঞ্চল ত্যাগ করার সময় ভারতের প্রায় দোরগোড়ায় আক্রান্ত হয়।

ভারতের সামুদ্রিক প্রতিবেশীর মধ্যে আমন্ত্রিত এক নৌ-অতিথির এই ধ্বংস কাজ  চালায় একটি দেশের সামরিক বাহিনী যার সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছেন। তাই ভারতের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করে ঘটনাটি । এই ঘটনার পর ভারত সরকারের নীরবতা চোখে পড়ার মতো; এই হামলার প্রকাশ্য নিন্দা এবং নিহত নাবিকদের প্রতি সমবেদনা জানানো থেকে বিরত থেকে নয়াদিল্লি আত্ম-প্রবর্তিত অপমানের ঝুঁকি নিচ্ছে। ভারতের দ্বারা স্বাগত জানানো একটি জাহাজের ডুবে যাওয়ার ঘটনায় আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অনুপস্থিতি আঞ্চলিক মর্যাদাকে কূটনৈতিক সুবিধার কাছে বিলিয়ে দেওয়ার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা ইঙ্গিত করে।

এদিকে ওয়াশিংটনে, মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী প্রকাশ্যে ভারতের কাছে তাদের সাবমেরিন দ্বারা ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার কথা গর্ব করে বলেছেন। বৈপরীত্যটা এর চেয়ে স্পষ্ট আর হতে পারে না। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনিকে হত্যা সত্ত্বেও ভারত নীরব রয়েছে।

মোদি – ইসরায়েল

ইরানের ওপর হামলা এবং খোমেনিকে হত্যার ঘটনা শুরু হয় নরেন্দ্র মোদির ইসরায়েল সফর এবং নেসেটে তার ভাষণ দেওয়ার অল্প পরেই। সফরের ধরনটি নিজেই অপমানজনক ছিল। খবরে বলা হয়, তাকে রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে নয়, বরং একজন যুদ্ধাপরাধী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

মোদি নেসেটের একটি অধিবেশনে ভাষণ দেন, যা সেদেশের বিরোধী দল বর্জন করেছিল, আর খালি আসনগুলি অ-সদস্যদের দিয়ে পূর্ণ করা হয়েছিল। তাকে, বিশেষ করে তার জন্যই তৈরি করা নেসেট পদকও দেওয়া হয়েছিল যার অস্তিত্ব এপর্যন্ত ছিল না।  সেখানে তিনি হাসিমুখে ইসরায়েলের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংহতি প্রকাশ করেন, ঠিক সেই সময় যখন ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরো বিশ্বের চোখের সামনে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নৌবহর ও সরঞ্জাম একত্রিত করছিল। এই তোষামোদপূর্ণ ও অপমানজনক আচরণ শুধু দেশকেই বিব্রত করেনি বরং ভারতকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল জোটের আগ্রাসনে অংশীদারের মতো দেখিয়েছে।

সফরের দুই দিনের মধ্যেই ইরানে হামলা চালানো হয়। কেউ বলতে পারে না যে ভারত বুঝতে পারেনি ইরানের ওপর হামলা আসন্ন,কারণ বাকি বিশ্বের  কাছে তা স্পষ্ট ছিল। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গাজাবাসীর দিক থেকে ভারতের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিকতা—ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান ইসরায়েলের গণহত্যার নিন্দা করতে সদা সতর্কতা, আর অভিযুক্ত “সন্ত্রাসবাদের” বিরুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে চলা।

মোদির অধীনে ভারত অনেক দূর এগিয়েছে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম সারির দেশগুলির একটি হওয়া থেকে ফিলিস্তিনি ইস্যুতে লজ্জাজনকভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, ক্রমশ একটি গণহত্যাকারী শাসনের আলিঙ্গনে ঢুকে পড়েছে।  ভারতের শীর্ষ শিল্পপতিরা ইসরায়েলি ড্রোন উৎপাদনে অংশ নিচ্ছে যা ফিলিস্তিনি এবং ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়।  ভারত সরকারের সদয় দৃষ্টির আড়ালে এসব ঘটছে ।

ভারত-ইরান

বর্তমান ভারত সরকার বছরের পর বছর ধরে বারবার দাবি করেছে ইরান ভারতের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী বন্ধু এবং সভ্যতাগত প্রতিবেশী। তবে ২০০০-এর দশকের শেষের দিক থেকে, ভারত ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রচেষ্টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইরানের সাথে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক কমিয়ে আনছে । ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করে, এবং বিনিময়ে ইরানের গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প পরিত্যাগ করে। এর থেকে  পারমাণবিক শক্তি খাতে সামান্যই লাভ হয়েছে অথচ  ইরানী গ্যাস ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত।

২০১৯ সাল থেকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে, ইরান যা একসময় ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল সরবরাহকারী ছিল, তার রপ্তানি ভারতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। চীন করেছে, কিন্তু ভারত সরকারের কাছে ভারী ছাড় দেওয়া ইরানি তেল আমদানির উপায় খুঁজে বের করার কোনো উদ্যোগ নেই।

তা সত্ত্বেও, ইরান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের একটি পরীক্ষিত বন্ধু। পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘদিনের বৈরিতার কারণে, মধ্য এশিয়ায় ভারতের একমাত্র কার্যকর পথ ছিল চাবাহার বন্দর দিয়ে, যা ইরান ভারতকে উন্নয়নের অনুমতি দিয়েছে, আফগানিস্তান এবং বৃহত্তর মধ্য এশীয় অঞ্চলের সাথে নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য সক্ষম করেছে। এমনকি তারপরও, ভারত প্রায়শই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে বন্দরটির উন্নয়নে পিছু হটেছে।

ভারতের জন্য চাবাহারের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। তথাপি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ভারতকে বন্দরটি অর্থায়ন ও নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার যে ছাড় দিয়েছিল তা প্রত্যাহার করে নেয় যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একটি শব্দও প্রতিবাদ  হিসাবে নেই। খবরে প্রকাশ, মার্কিন-ইসরায়েল অভিযানের প্রথম দিনেই চাবাহার বোমা হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল, যা ভারতের স্বার্থকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।

ইরান প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরের একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থি। পরিকল্পনাটি একটি ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাণিজ্য পথ যা ভারতকে রাশিয়া ও ইউরোপের সাথে সংযুক্ত করবে। করিডোরটি—যা যৌথভাবে ভারত, ইরান এবং রাশিয়া দ্বারা পরিকল্পিত—সমুদ্র, রেল ও সড়ক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মুম্বাইয়ের মতো বন্দরকে মস্কোর মতো শহরের সাথে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে  যা পরিবহন সময় ও ব্যয় যথেষ্টই হ্রাস করবে এবং একই সাথে ইউরেশীয় বাণিজ্য সংযোগ গভীর করবে।

ভারতের জন্য, এই প্রকল্পটি কৌশলগত তাৎপর্য বহন করে। এটি ইউরেশিয়ায় একটি পথ তৈরী করে যা পাশ্চাত্য-নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট এবং ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য পথকে এড়িয়ে চলে যা সম্ভাব্যভাবে ভারতকে মধ্য এশিয়া, রাশিয়া এবং ইউরোপে তার প্রবেশাধিকারে অধিক অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন দেবে। তথাপি ইরানের এই প্রকল্পের জন্য গুরুত্ব এবং ভারতের নিজস্ব দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য এর প্রভাব সত্ত্বেও, ইরানের ওপর হামলার মুখে নয়াদিল্লি নীরব থাকা বেছে নিয়েছে।

কাশ্মীর ইস্যুতে মাঝে মাঝে ভারতের অবস্থানের সমালোচনামূলক বিবৃতি দিলেও ইরান প্রায়শই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারতের স্বার্থ সমর্থন করেছে, যার মধ্যে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন কর্তৃক প্রস্তাবিত সেই সব প্রস্তাব বন্ধ করতে সাহায্য করা অন্তর্ভুক্ত যা ভারতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার দিকে নিয়ে যেতে পারত। আয়াতুল্লাহ খামেনেঈ-এর অধীনে, যার মতামত ইরানের বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করেছে, ইরান একটি বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল। তথাপি, ভারত সরকারের তাঁর হত্যার নিন্দা জানানোর সামর্থ্য ছিল না।

অগভীর এবং সুবিধাবাদী গণনা

মোদি সরকারের, ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন আধিপত্যের মুখে, ভারতের জোট-নিরপেক্ষতা, স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক মেরুদণ্ডের এই সামগ্রিক পরিত্যাগ—ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের অগভীর, সুবিধাবাদী গণনা থেকে উদ্ভূত। আরও স্পষ্ট করে বললে, এগুলি ভারতের বড় কর্পোরেট ঘরানার অর্থনৈতিক স্বার্থ, যাদের নরেন্দ্র মোদি তার পুরো রাজনৈতিক জীবন ধরে চ্যাম্পিয়ন করে চলেছেন এবং যাদের অগ্রাধিকারকে তিনি ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে দেশীয় ও বৈদেশিক নীতির ভিত্তিপ্রস্তর হিসাবে বিবেচনায় রেখেছেন।

ভারতের শীর্ষ দেশীয় একচেটিয়া ঘরানাগুলি ইসরায়েলি এবং মার্কিন কর্পোরেশন উভয়ের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার জন্য আগ্রহীভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে সার্বভৌম জাতীয় সক্ষমতা উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রতি সামান্য উদ্বেগ রেখে, এই ভারতীয় কর্পোরেশনগুলি সম্প্রতি তাদের প্রবৃদ্ধির পরবর্তী পর্যায়ের কৌশল হিসেবে মার্কিন সংস্থাগুলির সাথে অধীনস্থ প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বে প্রবেশ করছে। এর মাধ্যমে তারা মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার পেতে চাইছে, পাশাপাশি ভারতের দেশীয় অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত ভিত্তিকে অনুন্নত ও দরিদ্র রেখে দিচ্ছে।

ভারত সরকারের বৈদেশিক নীতি এবং দেশীয় অর্থনৈতিক কৌশল এই কর্পোরেট স্বার্থের চারপাশে গঠন করা হয়েছে। সরকার শুধুমাত্র এই লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি অধীনস্থ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার জন্য নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অন্য কোনো যৌক্তিকতা হতে পারে না। ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই যে অধীনস্থতার সম্পর্ক গড়ে তুলেছে তা নিশ্চিতভাবেই তার নিজের জনগণের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একটি ত্রুটিপূর্ণ কৌশল

ভারতের নিজস্ব প্রাঙ্গণে ভারতের অতিথিদের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড, শুধুমাত্র এই বিষয়টিই তুলে ধরে যে এই অধীনস্থ অংশীদারিত্ব ভারতের অর্থনীতি বা তার জনগণের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হচ্ছে না।

সম্প্রতি মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যান্ডাউ, ভারতে ভাষণ দেওয়ার সময়, তার কথায় কোনো প্রকার ছাড় দেননি যখন তিনি বলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারতকে, চীন যেভাবে উন্নত হয়েছে, সেভাবে মার্কিন বাজার কাজে লাগিয়ে উন্নত হতে দেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।

ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ, যা পরে কেবল ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয় এবং ভারতকে শূন্য শুল্ক গ্রহণের জন্য চাপ, ভারতকে তার অর্থনীতির জন্য উপকারী ছাড় দেওয়া রুশ তেল কেনা বন্ধ করতে বাধ্য করা, এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ভারতকে তার আন্তর্জাতিক দুঃসাহসিক অভিযানে অংশীদার করতে বদ্ধপরিকর, সেখানে আবার সমানভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে ভারত যেন কখনও নিজস্ব প্রযুক্তিগত ও শিল্প শক্তিতে পরিণত না হয়।

মার্কিন কর্মকাণ্ডের কারণে হরমুজ প্রণালীর কার্যকরভাবে বন্ধ, যার মধ্য দিয়ে ভারতের তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ যায়।  ভারতের মাত্র ২৫ দিনের তেল মজুত রাখা  ভারতীয় অর্থনীতির জন্য  একটি গুরুতর আঘাত যা মার্কিন সরকারের দান ।

একই সময়ে ভারত, এতদিন পর্যন্ত, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির শর্তের অধীনস্ত হওয়ায় ছাড় পাওয়া রুশ তেল কেনা থেকে  বিরত থাকতে হচ্ছে,  যে বাণিজ্য চুক্তি   সন্দেহজনক সুবিধা প্রদান করবে ।অতি সম্প্রতি ৬  মার্চ মার্কিন কোষাধ্যক্ষ বেসেট উদারভাবে পরামর্শ দেন যে ভারত তার মতো করে রুশ তেল এক মাসের মধ্যে কিনতে পারে; তার পরে, ভারতকে অনেক বেশি দামে মার্কিন তেল কিনতে হবে। এটি অর্থনৈতিক তোলাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়—যার কাছে মোদি সরকার অন্ধভাবে মাথানত করছে বলে মনে হয়।

এখানেই ভারতের জন্য মোদির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশলের বৌদ্ধিক শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত মার্কিন দুঃসাহসিক অভিযানে তোষামোদ করে, আন্তর্জাতিকভাবে যে পথে চলছে, তা শুধু নৈতিক ও নীতিগতভাবে ভুল নয়, এটি ভারত এবং তার জনগণের বস্তুগত স্বার্থের বিরুদ্ধেও যায়। কেউ কেবল আশা করতে পারে যে ভারত তার মেরুদণ্ড খুঁজে পাবে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্লোবাল সাউথের বাকি অংশের জন্য দাঁড়াবে, যদিও মোদির অধীনে তা অসম্ভব বলে মনে হয়।

 সূত্র: কাউন্টারকারেন্ট.কম ১২/০৩/২০২৬

বোদাপাটি শ্রুজনা ভারতের কৃষি সম্পর্ক বিষয়ক ক্ষেত্রে কাজ করেন এবং দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি সমীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। তিনি প্রায়ই ভারতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করেন।

ভাষান্তর :

বঙ্কিম দত্ত(AI সহায়তাসহ)

The post ইরানের ওপর মার্কিন যুদ্ধ মোদির ভারতের বৈদেশিক নীতির শূন্যতা উন্মোচন করেছে appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/society/iran-us-war-exposes-gap-in-modis-foreign-policy/feed/ 0 3312
আরাবল্লী পর্বতশ্রেণীর জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের পথে – আমরা কি নীরব দর্শক হয়েই থেকে যাবো? https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/the-biodiversity-and-overall-ecosystem-of-the-aravalli-mountain-range-are-on-the-verge-of-destruction/ https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/the-biodiversity-and-overall-ecosystem-of-the-aravalli-mountain-range-are-on-the-verge-of-destruction/#respond Mon, 22 Dec 2025 16:36:54 +0000 https://pariprashna.in/?p=3304 আরাবল্লী অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র প্রধানত শুষ্ক ও অর্ধ-শুষ্ক প্রকৃতির। এখানে শুষ্ক পর্ণমোচী বন, কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড়, তৃণভূমি এবং শিলাময় পাহাড়ি পরিবেশ একসঙ্গে বিদ্যমান। অল্প বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এই বাস্তুতন্ত্র মাটি সংরক্ষণ ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে কাঁটাযুক্ত বনভূমি ও তৃণভূমি মরুকরণ প্রতিরোধে কার্যকর প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে।

The post আরাবল্লী পর্বতশ্রেণীর জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের পথে – আমরা কি নীরব দর্শক হয়েই থেকে যাবো? appeared first on Pariprashna.

]]>
সন্তোষ সেন

ভারতের প্রাচীনতম পর্বতশ্রেণীগুলির মধ্যে আরাবল্লী পর্বতশ্রেণী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ বিলিয়ন বছর আগে গঠিত এই পর্বতশ্রেণী উত্তর-পশ্চিম ভারতের গুজরাট থেকে শুরু করে রাজস্থান, হরিয়ানা হয়ে দিল্লি পর্যন্ত বিস্তৃত। বয়সের দিক থেকে হিমালয়ের তুলনায় অনেক প্রাচীন হলেও পরিবেশগত গুরুত্বের দিক থেকে আরাবল্লীর ভূমিকা আজও অপরিসীম। এই পর্বতশ্রেণী একদিকে যেমন মরুকরণের অগ্রগতি রোধ করে, অন্যদিকে তেমনি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলচক্র নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আরাবল্লী অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র প্রধানত শুষ্ক ও অর্ধ-শুষ্ক প্রকৃতির। এখানে শুষ্ক পর্ণমোচী বন, কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড়, তৃণভূমি এবং শিলাময় পাহাড়ি পরিবেশ একসঙ্গে বিদ্যমান। অল্প বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এই বাস্তুতন্ত্র মাটি সংরক্ষণ ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে কাঁটাযুক্ত বনভূমি ও তৃণভূমি মরুকরণ প্রতিরোধে কার্যকর প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে।

আরাবল্লী পর্বতশ্রেণীর উদ্ভিদজগৎ বৈচিত্র্যময় ও পরিবেশের সঙ্গে সুসমন্বিত। এখানে ধাও, খেজুর, বাবুল, নীম, পালাশ ও বেলের মতো গাছ প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। এই উদ্ভিদগুলি খরা সহনশীল এবং অল্প জলেই টিকে থাকতে সক্ষম। এছাড়াও গুলঞ্চ, অশ্বগন্ধা, ও সাফেদ মুসলির মতো বহু ঔষধি উদ্ভিদ এই অঞ্চলে জন্মায়, যা স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

প্রাণিজগতের দিক থেকেও আরাবল্লী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে চিতল, সাম্বর হরিণ, নীলগাই, চিতা বিড়াল, শিয়াল, হায়েনা ও নেকড়ের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখা যায়। একসময় চিতা এখানে বিচরণ করলেও বর্তমানে তা বিলুপ্ত। পাখিজগতে ময়ূর, ঈগল, শকুন, বাজপাখি, বাবুই পাখি ও বিভিন্ন পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি আরাবল্লীর জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি সাপ, গিরগিটি ও অন্যান্য সরীসৃপও এই বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরাবল্লী পর্বতশ্রেণী জলসম্পদ সংরক্ষণে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। বর্ষার জল ধারণ করে এই পাহাড় ভূগর্ভস্থ জলকে পুনরায় সঞ্চিত করতে প্রভূত ভূমিকা পালন করে। লুনি, বানাস ও সবরমতীর মতো একাধিক নদীর উৎস এই পর্বতশ্রেণীতে অবস্থিত। ফলে আরাবল্লী না থাকলে থর মরুভূমির বিস্তার আরও দ্রুত পূর্ব দিকে অগ্রসর হত এবং উত্তর ভারতের জলসংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হত।

মানব সমাজের সঙ্গেও আরাবল্লীর সম্পর্ক গভীর। ভীল, মিনা ও গরাসিয়া প্রভৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে এই অঞ্চলের বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করে আসছে। তাঁদের জীবনধারা মূলত কৃষি, পশুপালন ও বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

তবে দুঃখজনকভাবে, আজ আরাবল্লী পর্বতশ্রেণী নানা সংকটের মুখোমুখি। অবৈধ খনন, নির্বিচার বন উজাড়, দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে এই প্রাচীন পর্বতশ্রেণীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলস্বরূপ জলস্তর নেমে যাচ্ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

আরাবল্লীর মাটির গভীরে থরে থরে সাজানো আছে নানান রকমের উৎকৃষ্ট ধাতব ও অন্যান্য খনিজ। কর্পোরেট বাহিনীর কাছে এইসব খনিজ মহা মূল্যবান। ওদের চাই সাত রাজার ধণ মানিক। মাটির গভীর গহীনে লুকিয়ে থাকা এইসব খনিজ চাই ওদের ব্যবসা বাণিজ্য বাজার ও মুনাফার জন্য। ওদের চাওয়াটাই শেষ কথা। তার যোগানের ব্যবস্থা কোন্ পথে হচ্ছে, তা বোঝার আগে একঝলকে দেখে নেওয়া যাক আরাবল্লীর মৃত সম্পদের ভান্ডার।

তামা : প্রাচীনকাল থেকেই আরাবল্লীর তামার খনন পরিচিত; বিশেষ করে Khetri ও আশপাশের অঞ্চলগুলোতে। 

সীসা ও জিঙ্ক : দক্ষিণ আরাবল্লী অঞ্চলে, বিশেষ করে রাজপুরা-দারিবা, রামপুরা-অগিচা, ইত্যাদি অঞ্চলে বড় মাপের সীসা-জিঙ্ক বেল্ট আছে। 

লোহা ও অন্যান্য বেস-মেটাল : আরাবল্লীর কুয়াচিত্রে আয়রন, সিলভার-সহ অন্যান্য ধাতুর উপস্থিতি নথিভুক্ত আছে। 

সোনা : আরাবল্লী বান্দর অঞ্চলের কিছু সেকশনে স্বল্প/বিস্তৃত সোনার সন্ধানও পাওয়া গেছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক জরিপে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম এর মতো পারমাণবিক খনিজের কিছু উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। 

এসবের পাশাপাশি সর্বাধিক পরিচিত শিল্প উপযোগী অধাতব খনিজ সম্ভার। যেমন –মার্বেল, গ্রানাইট, স্যান্ডস্টোনের জন্য  আরাবল্লী রেঞ্জ বিখ্যাত। এবং সিমেন্ট ও রত্ন শিল্পের কাঁচামাল –চুনাপাথর, ডোলোমাইট, জিপসাম, ওলাস্টোনাইট, কোয়ার্টজ, গারনেট, করান্ডাম, কায়ানাইট, স্টিয়াটাইট, ট্যালক/ সোপস্টোন, বেন্টোনাইট ইত্যাদি খনিজ রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। পুঁজির কালচক্রে এটাই আরাবল্লী পাহাড়, জঙ্গল ও স্থানীয় মানুষের চরম দুর্ভাগ্য।

তাই আগের থেকে ধ্বংস প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার কারণে আরাবল্লীর মৃতপ্রায় শরীরে শেষ পেরেকটি গেঁথে দিতে আদাজল খেয়ে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে কর্পোরেট বাহিনী ও তাদের সেবাদাস কেন্দ্রীয় সরকার। তাদের যুক্তি –দেশের উন্নয়নের স্বার্থে, জনগণের বিকাশের স্বার্থে কিছু না কিছু বলি তো দিতেই হয়। এখানে না হয় একটু বেশিই হয়ে গেছে। একটা গোটা পাহাড়, এই আর কী? ৬৭০ কিলোমিটার বিস্তৃত দেশের প্রাচীনতম পর্বতমালাটাই কর্পোরেটের ভোগে চলে গেল। চারটে বিশাল রাজ্যকে পাঁচিলের মত আগলে রাখা আরাবল্লী খনি-মাফিয়াদের পকেটে ঢুকে গেছে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক পাহাড় পর্বতের নতুন সংজ্ঞার উপর আদালত সিলমোহর দেওয়ায়। রাজামশাই বলেছেন, পাহাড় জঙ্গল নদী বলিপ্রদত্ত হলে ‘আচ্ছেদিন’ হুড়মুড় করে  আছড়ে পড়বে গণ দুয়ারে। পাহাড় ধূলিসাৎ করে দাও, জঙ্গল উচ্ছেদ করো। বন্যপ্রাণ তো কোন্ ছার, আদিবাসী জনগণ সহ একটা গোটা মানব সমাজকে পিষে মারো। ন্যায়াধীশ ও রাজামশায়ের কাছে আমাদের বিনীত জিজ্ঞাসা, মানব সমাজটাই বিলুপ্ত হয়ে গেলে আপনাদের উন্নয়নের ফলে ভোগ করবে কে?

রাজস্থানের আরাবল্লী গায়েব করে খনি বানানোর কয়েক হাজার কোটির বরাত আগের থেকেই দেওয়া আছে অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি আইএসএল’কে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তারা কাজ শুরুর ছাড়পত্তর পেল এই আর কী?

আনুমানিক কয়েকলক্ষ কোটি টাকার খনিজ নিজের গর্ভে লুকিয়ে রাখা আরাবল্লীর ফাঁসির হুকুম হয়েছে। হিসেব বরাবর।

কীভাবে এই ম্যাজিক ক্রিয়া সম্পন্ন হইল?

নতুন সংজ্ঞা অনুসারে স্থানীয় ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০০ মিটারের কম উচ্চতা হলে সেই পাহাড় বা টিলাকে নাকি আর পর্বত বলা যাবে না। লে হালুয়া! এতদিন জানতাম পাহাড়ের উচ্চতা মাপা হয় সমুদ্রতল থেকে। মামদোবাজি নাকি? এতকিছু নিয়মনীতি মানতে হলে উন্নয়ন মার খাবে না? অতএব, নতুন করে ভূপ্রকৃতির ইতিহাস রচনা করো। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০ মিটার উচ্চতার রাজস্থানের কোনও টিলার উচ্চতা যদি স্থানীয় ভূপৃষ্ঠ থেকে ৯৯ মিটারও হয়, তবে তা আর পাহাড় বলে গণ্য হবেনা। তাকে অবলীলায় গুঁড়িয়ে উন্নয়নের রথ ছুটিয়ে দেওয়া যাবে।

উন্নয়নের বুলডোজারে শুধু রাজস্থানেই গুঁড়িয়ে দেওয়া যাবে ১১,০০০ টিলা। ফলাফল? আরাবল্লী পর্বতমালা বলে কিছু আর অবশিষ্ট  থাকবে না। যে কটি পাহাড় বা টিলা স্থানীয় ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১০০ মিটারের বেশি উঁচু কেবল সেগুলোই কিছুদিন কোনক্রমে টিকে থাকবে। মাঝের প্রায় ৯০% টিলা খুবলে খাবে উন্নয়ন আর খনিমাফিয়ারা। খনিজ তুলবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডার কোম্পানি। আর কাটমানি ঢুকবে সরকারী নেতাদের পকেটে। সাথে রাজস্থানের মরুভূমির বালি, কচ্ছের ধুলো দমবন্ধ করে দেবে দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান, গুজরাতের কোটি কোটি শিশু, বৃদ্ধের। তাতে কী? দেশের জিডিপি তো বাড়বে নাকি? জিডিপির চরণামৃত খেয়ে বেঁচে থাকবে দেশের আপামর জনগণ।

আসলে, নয়া উদারবাদী অর্থনীতির যুগে ফাটকা পুঁজির ফানুস যাতে ফেটে না পড়ে, তারজন্যই এত আয়োজন। বাজার নির্ভর অর্থ-পুঁজির নতুন বিনিয়োগের জায়গা, আরো ব্যবসা, অধিকতর লাভের ব্যবস্থা করে দিতেই সুবিস্তৃত হিমালয় পর্বতরাজির সাড়ে সব্বনাশ করে এবার হাত পড়েছে মানবসভ্যতার আর এক প্রাণকেন্দ্র আরাবল্লীর উপর। পুঁজির রক্তে লেগেছে ধ্বংসের নেশা। ভাঙো, গুঁড়িয়ে দাও, লুঠপাট করে মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলো, এই নীতি নিয়েই চলেছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা। আর বাধা দিলে লাঠি, গুলি, বন্দুক, বেয়নেট, জেল হেফাজত তো আছেই। জল, জঙ্গল, নদী, পাহাড় লুঠ করে চলা নেতারা আজ দেশপ্রেমিক, দেশদেবক। আর প্রকৃতি বাঁচানোর লড়াইয়ে এগিয়ে এলে তাঁরা দেশদ্রোহী? 

ভুলে গেলে চলবে না, আরাবল্লী পর্বতশ্রেণী কেবল একটি ভৌগোলিক গঠন নয়; এটি উত্তর-পশ্চিম ভারতের পরিবেশগত মেরুদণ্ড। এর জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা মানে জলবায়ু, মানবসভ্যতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষা করা। তাই আরাবল্লী সংরক্ষণ আজ শুধু একটি পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, বরং একটি জাতীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ঐতিহাসিক ভূমিকা গ্রহণে ব্যর্থ হলে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। আমাদের দিকে আঙুল তুলে বলবে –কোথায় ছিল তোমাদের গণতান্ত্রিক চেতনা, কোথায় ছিল তোমাদের প্রগতিশীল ভূমিকা? সমাজ প্রকৃতি পরিবেশ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে কোন্ মহান কাজ তোমরা করেছ এযাবৎ কাল? শুধুই ধূ ধূ মরুভূমি, ধূলো ধোঁয়া, বালি, আর দূষণ জর্জরিত আকাশ বাতাস? এ বাতাসে আমরা শ্বাস নিতে পারিনা। আমাদের দমবন্ধ হয়ে আসছে। এখানে জল নেই। তেষ্টায় আমাদের গলা শুকিয়ে কাঠ। সবুজ বনানী নেই, ফল নেই, ফুল নেই, পাখি নেই। নেই আর নেই আর জগতে খনিজ চিবিয়ে কি আমরা বেঁচে থাকতে পারি?

The post আরাবল্লী পর্বতশ্রেণীর জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের পথে – আমরা কি নীরব দর্শক হয়েই থেকে যাবো? appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/the-biodiversity-and-overall-ecosystem-of-the-aravalli-mountain-range-are-on-the-verge-of-destruction/feed/ 0 3304
নির্মম নির্লজ্জ পুঁজি : মাতৃদুগ্ধের বাজারীকরণ মানব শরীরের মাসল গ্রোথের অজুহাতে https://pariprashna.in/article/health/ruthless-shameless-capital-the-commercialization-of-breast-milk-under-the-pretext-of-muscle-growth-in-the-human-body/ https://pariprashna.in/article/health/ruthless-shameless-capital-the-commercialization-of-breast-milk-under-the-pretext-of-muscle-growth-in-the-human-body/#respond Tue, 28 Oct 2025 18:42:53 +0000 https://pariprashna.in/?p=3295 বিজ্ঞানীরা কী বলছেন? বিশিষ্ট শিশুরোগ  বিশেষজ্ঞ অপূর্ব ঘোষ –“যে ধারণার ভিত্তিতে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ার এই ট্রেন্ড, তার কোন বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নেই। আমরা প্রকৃতিকে অস্বীকার করতে পারি না। মায়ের বুকের দুধ তার সন্তানের জন্যই তৈরি হয়”।

The post নির্মম নির্লজ্জ পুঁজি : মাতৃদুগ্ধের বাজারীকরণ মানব শরীরের মাসল গ্রোথের অজুহাতে appeared first on Pariprashna.

]]>
সন্তোষ সেন

কলকাতা সহ বিভিন্ন মেট্রো শহরে জিম করতে যাওয়া মাসলম্যানদের অনেকেই ট্রেনারের কাছে জানতে চাইছে, ব্রেস্ট মিল্ক কোথায় কিভাবে কিনতে পাওয়া যায়? কী কাজে লাগবে মাতৃদুগ্ধ? তাদের ধারণা ব্রেস্ট মিল্ক খেলে দারুন মাসল গ্রোথ হয়। কারণ এতে একটি বিশেষ ধরনের প্রোটিন আছে। কেমন চলছে এর বাজার? ভারতীয় জিমাররা হিউম্যান মিল্ক-এর খোঁজখবর সদ্য শুরু করলেও, এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে ‘পুঁজির স্বর্গদ্বার’ ট্রাম্পের দেশ আমেরিকা। সেখানকার বেশ কয়েকটি প্রদেশে হিউম্যান মিল্কের রমরমা ব্যবসা চলছে। হ্যাঁ ব্যবসাই চলছে মাতৃদুগ্ধ নিয়েও। মূলত বডিবিল্ডার ও জিমে নিয়মিত যাওয়া তরুণদের একাংশ শক্তপোক্ত পেশি গঠনের জন্য মাতৃদুগ্ধ পান করছেন। কিভাবে চলছে এই ব্যবসা? যাঁরা সদ্য মা হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই অনলাইনে নিজেদের বুকের দুধ বিক্রি করছেন। আর ই-কমার্স মার্কেট বা সরাসরি মায়েদের থেকে তা কিনছেন ‘জিম-ব্রো’ রা।

বিজ্ঞানীরা কী বলছেন? বিশিষ্ট শিশুরোগ  বিশেষজ্ঞ অপূর্ব ঘোষ –“যে ধারণার ভিত্তিতে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ার এই ট্রেন্ড, তার কোন বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নেই। আমরা প্রকৃতিকে অস্বীকার করতে পারি না। মায়ের বুকের দুধ তার সন্তানের জন্যই তৈরি হয়”। চিকিৎসক দীপেন্দ্র সরকার –“এই বিষয়টি অবশ্যই বন্ধ হওয়া দরকার। এমনকি এই নিয়ে কোন গবেষণাকেও উৎসাহ দেওয়া উচিত নয়”। ব্রেস্ট মিল্ক পান করলে মাসল গ্রো করবে এমন ধারণাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কুনাল সুদ বলছেন  –“মানুষের ব্রেস্ট মিল্কের প্রায় ৮৮ শতাংশ জল। আর ১০০ মিলিলিটার মাতৃদুগ্ধে প্রোটিন থাকে মাত্র ১.৫ গ্রাম, অন্যদিকে গরুর দুধে থাকে ৭.৯ গ্রাম প্রোটিন”। 

মায়ের বুকের দুধে মাসল গ্রোথের ধারণা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক, অনৈতিক এবং প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে হলেও কিভাবে শুরু হল এই ট্রেন্ড? আমেরিকা সহ কয়েকটি দেশে (এমন কি আমাদের মতো দেশেও) এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ার পিছনে প্রধান কালপিট একটি ওয়েব সিরিজ –‘দ্যা বয়েজ’। এই সিরিজ আনা হয় পুঁজিকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম পিলার অ্যামাজন গ্রুপের প্রাইম ভিডিওতে। এই সিরিজের সুপার হিরো ‘হোমল্যান্ডার’ নিজেকে ইমোশনালি ও ফিজিক্যালি ফিট রাখতে হিউম্যান ব্রেস্ট মিল্ক পান করতেন। এটাকে লুফে নিল পুঁজির আরেক পিলার সোশ্যাল মিডিয়া।  ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক এই বিষয়টিকে শেষ পর্যন্ত আমেরিকা সহ আরও বেশ কিছু দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ট্রেন্ড করে ফেলল মিথ্যার বেসাতি করে। ফলে নানান দেশেই মাতৃদুগ্ধ পানের যেন হিড়িক পড়ে গেছে। মূলত অ্যামাজন, eBay-এর মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো কেনাবেচা করছে ব্রেস্ট মিল্ক। লুকিয়ে চুরিয়ে বেআইনি ও অস্বাস্থ্যকর ভাবে বিক্রির রিপোর্টও কিছু কিছু পাওয়া যাচ্ছে। পচাগলা পুঁজিবাদী সমাজে সবই সম্ভব। বাজারের এমনই মহিমা যে, 

একসময় সন্তানদের মায়ের দুধের বদনাম করে বৃহৎ কোম্পানির অবৈজ্ঞানিক কৌটোর দুধ বেশি দামে গেলায়, আবার এখন মাহাত্ম্য প্রচার করে সেই দুধ নিয়ে বাণিজ্য করে। 

আমেরিকার ‘ভাইস’ পত্রিকার সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, অনেক নতুন মা এখন বুকের দুধ বিক্রি করে মাসে কয়েক হাজার ডলার আয় করছেন। বিশেষ করে সন্তান প্রসবের পর প্রথম পাঁচ দিন মায়ের দুধে যে কোলোস্ট্রাম নিঃসরণ হয়, তার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। সন্তানের পুষ্টি, বেড়ে ওঠা, ও রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কোলোস্ট্রাম সহ মায়ের দুধের অপরিহার্য ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনায় আসা যাক।

সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে পুরুষের শুক্রাণু শুধুমাত্র নারীর ডিম্বাণু নিষিক্ত করার কাজে লাগে। পুরুষের এইটুকু ভূমিকার পর সন্তানের জন্ম ও বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পুরোটাই নারীদের অপরিসীম অবদান। আর এই প্রক্রিয়ায় যোগ্য সঙ্গত করে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম। বিজ্ঞান বলছে, একটি মানুষের শরীরে ৩৯ ট্রিলিয়ন উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে। এই কোটি কোটি অনুজীব মানুষের নাক কান মুখ দিয়ে অন্ত্রে প্রবেশ করে। এর একটা অংশ নিয়ে গড়ে ওঠে প্লেসেন্টাল মাইক্রোবায়োম। নারীর গর্ভে অমরার (placenta) জলীয় স্তরে ভ্রূণ ভেসে থাকে, যাকে পুষ্টির যোগান ও সমস্ত রকমের সুরক্ষা দেয় প্লেসেন্টাল মাইক্রোবায়োম। সন্তান ভুমিষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়ায় এইসব উপকারি বন্ধু ব্যাকটেরিয়ার দল বাসা বাঁধে মায়ের স্তনে। তৈরি হয় প্রকৃতির অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ কোলোস্ট্রাম (colostrum), যার উপকার বলে শেষ করা যায় না। 


আরও পড়ুন: স্বাধীনতা সংগ্রামে RSS ও হিন্দু মহাসভার কোনো ভূমিকা ছিল না


প্রথমত: সদ্যোজাতদের পেটে জমা হয় প্রচুর পরিমাণ বিলিরুবিন। সদ্যোজাতকে মায়ের বুকের প্রথম দুধ খাওয়ালে এইসব উপজাত শিশুর মলের (meconium) সাথে বেরিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত: প্রোটিন ও পুষ্টির যোগান দেওয়ার পাশাপাশি কোলোস্ট্রাম বাচ্চাদের শরীরে প্রতিষেধক ও অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করে, যা একটি শিশুর সুস্থ-সবল ভাবে বেড়ে ওঠার প্রধান কারিগর। কম ওজনের নবজাতককে কোলোস্ট্রাম খাওয়ালে তার ওজন বৃদ্ধিতেও প্রভূত সাহায্য করে। আর শিশুদের ছয় মাস ধরে শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাইয়ে গেলে তাদের পুষ্টি- বৃদ্ধি ও শারীরিক গঠন তৈরিতে যে অসাধ্য সাধন করে তা পাঠকদের কমবেশি জানা।

প্রকৃতির এইসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে পুঁজি। যার কুফল ভোগ করতে হচ্ছে শিশু, মহিলা, সহ সমগ্র মানব প্রজাতিকে। নব্য উদার অর্থনীতির যুগে ব্যাঙ্ক-পুঁজি ও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল আজ ফুলেফেঁপে এক কাল্পনিক অর্থ-পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। যা টিকে আছে নব নব ক্ষেত্রে পুঁজির বিনিয়োগ, বাজার, ব্যবসা ও আরও মুনাফা এই দুষ্ট চক্রের মধ্য দিয়ে। মৃতপ্রায় পুঁজিকে অক্সিজেন জোগাতেই নারীর শরীর ও মনকে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। নারীর নিজস্ব মাতৃগর্ভকেও ‘সারোগেটিভ মাদার’ কনসেপ্টের মধ্য দিয়ে বাজারে বিক্রি করতে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। এই বাজারও চলছে রমরমিয়ে। যার ক্রেতা মূলত অর্থবান পুরুষ সমাজ। 

পুঁজির নির্মম খেলায় শেষ পর্যন্ত শিশুর গ্রাস, মায়ের বুকের দুধকেও বাজারে বিক্রি করা শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্বল ও শ্রম দিয়ে তৈরি করা প্রতিটি সামগ্রীর ব্যবহার মূল্যকে পরিণত করা হচ্ছে বিনিময় মূল্য বা এক্সচেঞ্জ ভ্যালুতে। হে পেশীবহুল বডিবিল্ডার বাবু বিবি গণ, তোমাদের তো অর্থের অভাব নেই। খাও না বাপু যতখুশি অ্যানিমাল প্রোটিন, উদ্ভিজ প্রোটিন, বা নামীদামী ফার্মা কোম্পানির সাজিয়ে দেওয়া হরেক রকম সাপ্লিমেন্ট ফুড। প্রকৃতির অপূর্ব দান কোলোস্ট্রাম ও মায়ের বুকের দুধকেও পণ্যে পরিণত করার অধিকার কে দিয়েছে তোমাদের? হায়রে পুঁজি! কী নির্মম নিষ্ঠুর ভাবে আজ টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে তোমার অস্তিত্বকে।

শক্তপোক্ত মাসল তৈরি করার নামে মাতৃদুগ্ধের বাজারীকরণ অবিলম্বে বন্ধ না করতে পারলে, আমাদের মতো দেশের এক বড় অংশের গরীব মায়েরা সংসার চালানোর জন্য বাধ্য হবেন বাজারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে। এমনিতেই বিভিন্ন দেশের এক বিরাট সংখ্যক শিশু ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে। আর নতুন এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের বুকের দুধ না পেয়ে এক অসুস্থ, অশক্ত, পঙ্গু প্রজন্ম তৈরি হবে। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ও ছন্দের বিরুদ্ধে গেলে, তার ফল হবে ভয়ঙ্কর বিষময়। মায়ের বুকের দুধের এক এবং  একমাত্র অধিকারী সন্তান। লোভী স্বার্থপর মানুষ, পুঁজি, বাজার কারোরই কোন অধিকার নেয় শিশুদের জন্য সৃষ্ট প্রকৃতির অমোঘ অপূর্ব দানের উপর। পয়সা দিয়ে সবকিছু কেনা যায় না, এটা বিস্মৃত হওয়া মানে ভয়াবহ বিপর্যয়কে সাদরে বরণ করে নেওয়া।

তথ্যসূত্র: এই সময় পত্রিকা, ২৭.১০.২৫

The post নির্মম নির্লজ্জ পুঁজি : মাতৃদুগ্ধের বাজারীকরণ মানব শরীরের মাসল গ্রোথের অজুহাতে appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/health/ruthless-shameless-capital-the-commercialization-of-breast-milk-under-the-pretext-of-muscle-growth-in-the-human-body/feed/ 0 3295
পরিবেশ আন্দোলনের শ্রেণিচরিত্র: মধ্যবিত্ত নাকি শ্রমিক? https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/class-character-of-environmental-movement/ https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/class-character-of-environmental-movement/#respond Thu, 31 Jul 2025 11:22:36 +0000 https://pariprashna.in/?p=3267 পরিবেশ আন্দোলন কি শুধুই শহুরে মধ্যবিত্তদের চিন্তার ফসল, না কি শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্বের লড়াই? পরিবেশ আন্দোলনের শ্রেণিচরিত্র বিশ্লেষণ করলেন বঙ্কিম দত্ত।

The post পরিবেশ আন্দোলনের শ্রেণিচরিত্র: মধ্যবিত্ত নাকি শ্রমিক? appeared first on Pariprashna.

]]>
বঙ্কিম দত্ত

” একটা সবুজ পৃথিবী চাই!”

এই স্লোগান আজ রাস্তায়, বিদ্যালয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ায়—সর্বত্র। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘সবুজ’ পৃথিবীর জন্য লড়াই কারা করছে? কারা এই লড়াইয়ের আসল শরিক, আর কারা কেবল সচেতনতার ব্যানার নিয়ে সামনে এসেছে? পরিবেশ আন্দোলনের এই শ্রেণিচরিত্র—অর্থাৎ এটি কি মূলত মধ্যবিত্তদের চিন্তাজগতের ফসল, না কি শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্বের লড়াই—এই প্রশ্ন ওঠাটা আজ সময়ের দাবি।

আধুনিক পরিবেশ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ইউরোপ ও আমেরিকায়। ১৯৭০-এর দশকের ‘আর্থ ডে’ থেকে শুরু করে গ্রেটা থুনবার্গের “ফ্রাইডেস ফর ফিউচার”—সব কিছুতেই চোখে পড়ে এক ধরনের মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, শহুরে শ্রেণির নেতৃত্ব। এই আন্দোলনগুলো জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক বর্জন, পুনঃব্যবহারযোগ্য শক্তি, এবং কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করেছে—এ কথা অস্বীকার করা যাবে না।

কিন্তু এই মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের মধ্যে একটা মৌলিক সীমাবদ্ধতা আছে। তারা সমস্যাকে অনেকটা ‘মোড়ক’ হিসেবে দেখে—একটি ‘গ্লোবাল ক্রাইসিস’ হিসেবে। তারা দুর্যোগের ছবি তুলে ধরে, তথ্য প্রকাশ করে, কিন্তু এ সংকট যে শ্রেণিভিত্তিতে ভিন্ন প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে তারা অনেক সময় নীরব থাকে। এই আন্দোলনের ভাষা  প্রযুক্তিনির্ভর, নীতিনির্ধারকমুখী—যার সাথে মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষদের বাস্তবতা অনেক দূরে।

প্রকৃত অর্থে পরিবেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয় সেই মানুষদের, যাদের জীবিকা প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। কৃষক, মজুর, মৎস্যজীবী, বনবাসী, খনি শ্রমিক, চরবাসী, নদীভাঙনের শিকার মানুষ—প্রতিদিন জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন তারাই।

খরা মানে শুধু কম বৃষ্টি নয়। এর মানে চাষ বন্ধ হওয়া। বন্যা মানে শুধু রাস্তাঘাট ভেসে যাওয়া নয়,  ঘর হারানো ও বে-রোজগার । জঙ্গল কাটা মানে শুধু গাছের ক্ষতি নয়, এর মানে এক একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর জীবনের ভেঙে পড়া। অথচ এই শ্রেণির কথা পরিবেশ আন্দোলনের মূলধারায় প্রায়শই অনুপস্থিত।

পরিবেশ নিয়ে যে শুধু শিক্ষিত শহুরে মানুষেরাই ভাবে, এমনটা মনে করা  এক ধরনের শ্রেণি-ভিত্তিক ভ্রান্তি। চিপকো আন্দোলন বা নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়—এইসব আন্দোলনের চালিকাশক্তি ছিল মূলত শ্রমজীবী কৃষক ও নারী আদিবাসীরা।

চিপকো আন্দোলনে গাছকে জড়িয়ে ধরে রক্ষা করেছিলেন পাহাড়ি গ্রাম্য নারী শ্রমিকেরা। কারণ গাছ কাটা মানে পাহাড়ে ভূমিক্ষয়, জলের উৎসের বিলুপ্তি এবং সর্বোপরি জীবিকার বিপর্যয়। আবার নর্মদা নদীর ড্যামের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, তাও কোনো ‘গ্লোবাল গ্রিন ক্যাম্পেইন’ ছিল না। তা ছিল নিজেদের ভূমি, বসতভিটা, চাষের জমি রক্ষা করার লড়াই।

এইসব লড়াইয়ে ‘পরিবেশ’ শব্দটা হয়তো বারবার উচ্চারিত হয়নি, কিন্তু সেই লড়াইয়ের ভিতরেই লুকিয়ে আছে আসল পরিবেশচেতনা—যা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, শুধুমাত্র আদর্শগত ভাবে নয়, বরং কঠিন বাস্তব হয়ে ।

শহরের  মধ্যবিত্ত শ্রেণি পরিবেশ রক্ষাকে দেখছে মূলত ভোগের পরিবর্তনের মাধ্যমে—বাইসাইকেল চালানো, কাগজের ব্যাগ ব্যবহার, প্লাস্টিক বন্ধ করা ইত্যাদি। এগুলো  গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও, তাতে মূল ব্যবস্থার ভিত্তি বদলায় না। বরং এক ধরনের “ইকো-আত্মতুষ্টি” তৈরি হয়—নিজেকে দায়মুক্ত করার একটি ‘গ্রিন পাস’ যেন।

অন্যদিকে, শ্রমিক শ্রেণির চেতনা আসে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা থেকে। তারা জানেন, কয়লাখনি বা নির্মাণশিল্পে কাজ করতে গিয়ে তারা যেমন নিজের স্বাস্থ্য হারান, তেমনই পরিবেশেরও ক্ষতি হয়। কিন্তু বিকল্প না থাকায় তারা বাধ্য হন এই বিপজ্জনক শ্রমে। ফলে পরিবেশ আন্দোলন তাদের জন্য একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন—অর্থনৈতিক শোষণ ও পরিবেশগত ধ্বংসের বিরুদ্ধে একযোগে লড়াই।

পরিবেশ আন্দোলন যদি সত্যিই কার্যকর এবং র‍্যাডিকাল হতে চায়, তবে তাকে এই শ্রেণিচরিত্রের বিষয়টি মেনে নিতে হবে। কেবলমাত্র সচেতন মধ্যবিত্তর শ্লোগান বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আন্দোলনের ভাষা, নেতৃত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি—সবই শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে গ্রহণ করতে হবে।

এখানে প্রয়োজন এক নতুন ধরনের সংহতি—যেখানে শিক্ষিত সমাজ শ্রেণিবিশেষের সুবিধাজনক অবস্থা থেকে নেমে এসে শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ে অংশ নেবে। কারণ পরিবেশ সংকট শুধু তথ্যগত নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাত—সম্পদ কাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে তার প্রশ্ন।

পরিবেশ আন্দোলনকে  ‘সবুজ বিপ্লব’ বা ‘লাল-সবুজ বিপ্লব’ যাই বলা হোক, এই বিপ্লবের নেতৃত্ব নিচুতলার মানুষদের হাতেই আসা দরকার।

সবুজ অর্থ শুধু গাছ নয়, এটি জীবিকা, মাটি, জল, এবং শোষণমুক্ত ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। আন্দোলনের নেতৃত্বের প্রশ্নে একে লাল হতেই হবে। অন্যথায় সমাধান দুরস্ত।

পরিবেশ আন্দোলনের শ্রেণিচরিত্রকে অস্বীকার করলে আন্দোলন ব্যর্থ হবে। কারণ সমস্যা যদি শোষণ ও বৈষম্যভিত্তিক হয়, তাহলে তার সমাধানও হতে হবে শ্রেণিসচেতন এবং র‍্যাডিকাল।

আমাদের প্রয়োজন একটি একীভূত পরিবেশ আন্দোলন—যেখানে পরিবেশ বাঁচানোর মানে হবে শুধু বাতাস পরিষ্কার রাখা নয়, সেইসব মানুষের কণ্ঠকে প্রাধান্য দেওয়া, যারা প্রকৃতির সবচেয়ে কাছাকাছি বাস করে, এবং সবচেয়ে বেশি শোষিত হয়।

তাদের হাতেই হোক আগামী দূষণমুক্ত পৃথিবীর সূচনা।

আগের যে লেখাগুলো পড়তে পারেন

The post পরিবেশ আন্দোলনের শ্রেণিচরিত্র: মধ্যবিত্ত নাকি শ্রমিক? appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/class-character-of-environmental-movement/feed/ 0 3267
পরিবেশবিদ্যাই স্থায়ী অর্থনীতি https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/ecology-is-a-sustainable-economy/ https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/ecology-is-a-sustainable-economy/#comments Tue, 01 Jul 2025 05:39:21 +0000 https://pariprashna.in/?p=3260 প্রকৃতির জটিলতা বোঝা বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই সাধনায় মানুষ পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মডেলিংয়ের মাধ্যমে অসাধারণ প্রচেষ্টা চালিয়েছে, কারণ এই বোঝাপড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং টেকসই অনুশীলনের জন্য তথ্য প্রদানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

The post পরিবেশবিদ্যাই স্থায়ী অর্থনীতি appeared first on Pariprashna.

]]>
পি. রাঘবন

পরিবেশবিদ সুন্দরলাল বহুগুণার জনপ্রিয় করা “পরিবেশবিদ্যাই স্থায়ী অর্থনীতি” এই বাক্যটি একটি স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি একটি মৌলিক সত্যের গভীর স্মরণিকা যে মানুষের সমৃদ্ধি পরিবেশগত স্বাস্থ্যের সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িত। এটি সত্য যে প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সেগুলো সংরক্ষণ ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অসম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের দ্রুত ক্ষতির মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে যে আমরা কি সত্যিই এই ধারণাটি বুঝেছি এবং গ্রহণ করেছি।

সঠিক ভারসাম্য অর্জন

প্রকৃতির জটিলতা বোঝা বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই সাধনায় মানুষ পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মডেলিংয়ের মাধ্যমে অসাধারণ প্রচেষ্টা চালিয়েছে, কারণ এই বোঝাপড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং টেকসই অনুশীলনের জন্য তথ্য প্রদানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এই বৈজ্ঞানিক আলোচনাগুলো মূল্যবান, তবে আমাদের আরও জরুরি এবং মৌলিক একটি সত্যের উপর মনোযোগ দিতে হবে: পরিবেশবিদ্যাই হলো প্রকৃত অর্থনীতি — আমাদের বেঁচে থাকা, নিরাপত্তা এবং অগ্রগতি এর উপর নির্ভর করে। সহজ কথায়, এটাই হতে পারে টেকসই তার সবচেয়ে স্পষ্ট সংজ্ঞা — পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়তার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে বের করা। এই ভারসাম্য ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশ বা অর্থনীতি কোনোটিই সমৃদ্ধ হতে পারে না।

প্রাণীজগতের অংশ হওয়া সত্ত্বেও, সভ্যতার পথে মানুষের বিবর্তন প্রকৃতির সাথে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে গেছে। প্রকৃতির সাথে এই বিচ্ছিন্নতাকে চলমান জীববৈচিত্র্য ক্ষতির একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (সাম্প্রতিক আন্তঃসরকারি বিজ্ঞান-নীতি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভার্সিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস বা আইপিবিইএস ট্রান্সফরমেটিভ চেঞ্জ রিপোর্ট)।

মানুষের ইতিহাসের প্রাথমিক পর্যায়ে, যাযাবর জীবনযাত্রা ব্যক্তিদের তাদের মৌলিক, দৈনন্দিন বেঁচে থাকার প্রয়োজনের জন্য শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করতে এবং তা ব্যবহার করতে বাধ্য করেছিল। সময়ের সাথে সাথে এই ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সম্পদ ব্যবহার ক্রমবর্ধমান সম্প্রদায়ের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে সমষ্টির ভোগে পরিণত হয়েছে। মানব সমাজ যখন সম্প্রসারিত হয়ে জাতি হিসেবে সংগঠিত হয়েছে, তখন এই চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেয়ে সমগ্র দেশের প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিস্তৃত হয়েছে। অবশেষে এই অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে জাতিসমূহ শুধুমাত্র বর্তমান চাহিদা মেটানোর জন্যই নয়, বরং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য সম্পদ নিরাপত্তার জন্যও প্রকৃতিকে শোষণ করতে শুরু করেছে। মানুষের বিপরীতে, প্রাণীজগতের অন্য কোনো প্রজাতি প্রাকৃতিক সম্পদের এই ধরনের বৃহৎ আকারের, প্রত্যাশিত শোষণের নমুনা প্রদর্শন করে না। অন্যান্য প্রাণী তাদের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাস করে, তাৎক্ষণিক বেঁচে থাকার জন্য যা প্রয়োজন শুধু তাই গ্রহণ করে, তারা যে বাস্তুতন্ত্রে বাস করে তার দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য বিঘ্নিত না করে।

নতুন জটিলতা 

মানুষের ক্রমবর্ধমান ভোগবাদ ও বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার চক্র পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের উপর অপ্রতিদ্বন্দ্বী চাপ সৃষ্টি করেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করেছে—এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা এখন মানব সৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে বিপজ্জনকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতিক্রিয়ায়, প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানকে সারাবিশ্বে সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় ব্যাপকভাবে সমর্থন করা হয়েছে। এই পদ্ধতিগুলির লক্ষ্য হলো বাস্তুতন্ত্রের সহজাত সহনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে জলবায়ুর প্রভাব প্রশমিত করা, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করা এবং টেকসই উন্নয়নকে সমর্থন করা। তবে এখানে একটি বৈপরীত্য দেখা দেয়: আমরা আমাদের প্রয়োজেন ও লালসা মেটাতে প্রকৃতির শোষণ চালিয়ে যাচ্ছি, আবার একই সময়ে এই শোষণের ফলাফল থেকে রক্ষা পেতে একই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করছি। এই দ্বৈত নির্ভরতাবাস্তুতন্ত্রের আরও গভীর ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ায় এবং জলবায়ুসংকট মোকাবিলার সামর্থ্যকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। 

এই প্রেক্ষাপটে, বাস্তুতন্ত্রের জটিলতাকে কেবল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার চেষ্টা করার বদলে একটি মৌলিক সত্যকে স্বীকার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ–বাস্তুতন্ত্রই হলো স্থায়ী অর্থনীতি। এই নীতিকে স্বীকার করে নিলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্পমেয়াদি শোষণ থেকে দীর্ঘমেয়াদি তত্ত্বাবধানের দিকে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে বাস্তুতান্ত্রিক সুস্থতাকে একটি বাধা হিসেবে নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। 

এই উপলব্ধি কেবল সময়োপযোগী নয়—এটি চলমান পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা ও একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য অপরিহার্য। কেবল এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমেই মানবতা প্রতিক্রিয়াশীল সংরক্ষণ থেকে সক্রিয় গ্রহ-স্তরের টেকসইযোগ্য ব্যবস্থায় এগিয়ে দিতে পারে। জলবায়ুসংকট কেবল একটি বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ নয়। এটি আমাদের অস্তিত্বের বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তির সাথে একটি নৈতিক ও অস্তিত্বগত হিসাব-নিকাশ।

প্রকৃতির সাথে পুনর্সংযোগের প্রয়োজন 

জলবায়ু পরিবর্তন ও জীব বৈচিত্র্যের বণ্টন প্যাটার্নের পরিবর্তন পৃথিবীর জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু, অতীতে মানুষের অস্বাস্থ্যকর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এটি এখন যে হারে ঘটছে, তা গ্রহের জীববৈচিত্র্য—যার মধ্যে মানুষও অন্তর্ভুক্ত—এর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই, আমাদের যে পরিবর্তন দরকার, তা আসতে হবে ভেতর থেকে। 

যেহেতু বিশ্বজুড়ে সব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, তাই টেকসই জীবনযাপন পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব—যাতে বিশ্ব জুড়ে গড়ে ওঠা টেকসইমুখীন উদ্যোগ সফল হয়। এটি অর্জনের জন্য আমাদের বুঝতে হবে যে, মানুষ প্রকৃতিরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আধুনিক জীবনযাত্রাকে প্রকৃতি থেকে দূরে ঠেলে দিলেও, মানুষের একটি অনন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হলো—আমরা এখনও আবেগের মাধ্যমে প্রকৃতির সাথে পুনঃসংযোগ স্থাপন করতে পারি (এই ক্ষমতা এখনও আমাদের মধ্যে বেঁচে আছে)। তাই, ভবিষ্যতের সংরক্ষণ প্রচেষ্টা এমনভাবে তৈরি করা উচিত যাতে প্রকৃতির সাথে আমাদের আবেগগত বন্ধন শক্তিশালী হয়। এটি জাগ্রত করতে, “বাস্তুতন্ত্রই স্থায়ী অর্থনীতি”—এই উপলব্ধি প্রকৃতির জটিলতা বোঝার চেয়েও বেশি জরুরি। 

ভাষান্তর:  বঙ্কিমদত্ত

লেখক পি. রাঘবন একজন বিজ্ঞানী যাঁর গবেষণায় আগ্রহের অন্যতম বিষয় বাস্তুতন্ত্র ও বায়ো-জিওকেমিস্ট্রি। তিনি ভারতের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র (ব্লু-কার্বন হ্যাবিট্যাট)-এ ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ ও কার্বন ডাইনামিক্সনিয়ে কাজ করছেন।

সৌজন্যে: দ্য হিন্দু

আগের লেখা: মধ্যপ্রাচ্যেই কি হবে আমেরিকা- সাম্রাজ্যবাদের কবর?

The post পরিবেশবিদ্যাই স্থায়ী অর্থনীতি appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/ecology-is-a-sustainable-economy/feed/ 1 3260
মধ্যপ্রাচ্যেই কি হবে আমেরিকা- সাম্রাজ্যবাদের কবর? https://pariprashna.in/article/society/will-the-middle-east-be-the-grave-of-american-imperialism/ https://pariprashna.in/article/society/will-the-middle-east-be-the-grave-of-american-imperialism/#comments Mon, 23 Jun 2025 12:43:02 +0000 https://pariprashna.in/?p=3255 জি-৭ সামিট থেকে ট্রাম্প তড়িঘড়ি ফিরেছেন, তবে ফেরার আগে জি-৮ বা জি-৯ হয়ে ওঠার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। আসলে ২০১৪ সালে জি-৮ থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়া হয়। আজ রাশিয়া এবং চীন অনেক কাছাকাছি। ২০০৮র আর্থিক মন্দার পরে ২০০৯-য়ে তৈরি হওয়া ব্রিক্স ক্রমশ:  জাল বিস্তার করছে মধ্যপ্রাচ্যে। এতখানি মাথাব্যথার মধ্যে  আবার ট্রাম্প একটু নিঃসঙ্গতা  বোধ করছেন। কারণ জি-৭ এর বাকি সদস্যরা এখনি কেউ যুদ্ধে নামতে রাজি নয়।

The post মধ্যপ্রাচ্যেই কি হবে আমেরিকা- সাম্রাজ্যবাদের কবর? appeared first on Pariprashna.

]]>
প্রীতিলতা বিশ্বাস

পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে আলোচনা চলাকালীন অবস্থাতেই ইজরায়েল ১৩ই জুন একতরফা  ইরানের পরমানু কেন্দ্রের উপর হামলা চালায়। ইরানের সেনাপ্রধান ও প্রথম সারির একজন পরমাণুবিজ্ঞানী মারা যান। ইরানও  এর জবাব দিতে কালক্ষেপ করেনি। বর্তমানে পূর্ণমাত্রার একটি যুদ্ধ চলছে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে। ইজরায়েল ভীষণ চেষ্টা করছে আমেরিকাকে এই যুদ্ধের মধ্যে সরাসরি টেনে আনার। ট্রাম্প, ইরানকে হুমকি-ধমকি এবং ইজরায়েলকে প্রচ্ছন্ন মদতের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিল প্রায় আট/নয় দিন। কিন্তু দশতম দিনে সরাসরি ইরানের তিনটি পরমাণু-কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে আমেরিকা।

জি-৭ সামিট থেকে ট্রাম্প তড়িঘড়ি ফিরেছেন, তবে ফেরার আগে জি-৮ বা জি-৯ হয়ে ওঠার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। আসলে ২০১৪ সালে জি-৮ থেকে রাশিয়াকে বাদ দেওয়া হয়। আজ রাশিয়া এবং চীন অনেক কাছাকাছি। ২০০৮র আর্থিক মন্দার পরে ২০০৯-য়ে তৈরি হওয়া ব্রিক্স ক্রমশ:  জাল বিস্তার করছে মধ্যপ্রাচ্যে। এতখানি মাথাব্যথার মধ্যে  আবার ট্রাম্প একটু নিঃসঙ্গতা  বোধ করছেন। কারণ জি-৭ এর বাকি সদস্যরা এখনি কেউ যুদ্ধে নামতে রাজি নয়। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধটা লাগিয়ে দিয়ে আমেরিকা এমনিতেই দেশগুলোকে  রাশিয়ার জ্বালানী তেলের যোগান থেকে বঞ্চিত করেছে। আবার বেশি দামে নিজের তেল বিক্রিও করে ওদের। তাসত্ত্বেও  সদস্য দেশগুলো বিবৃতির মাধ্যমে নিজেদের দ্বিচারিতাকে সুন্দর করে তুলে ধরেছে। গাজার পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ, যার প্রায় অর্ধেক শিশুক, তাদের হত্যা করাটা ছিল ইজরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার! এখন আগবাড়িয়ে ইরানকে আক্রমণ করাটাও নাকি তার আত্মরক্ষার অধিকার!

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল সরাসরি উপনিবেশ দখলের লড়াই। তখন রাষ্ট্রের শাসক ও মিলিটারির হাতে ধরা থাকত দড়ি টানাটানির দড়িটা। এখন ইলন মাস্ক আর ট্রাম্পের সোস্যাল মিডিয়ার বাক-বিতন্ডাই বলে দেয় দড়িটা আসলে কারা টান দিচ্ছে। এখনও আমেরিকার অস্ত্র-ব্যবসায়ীদের লবি যুদ্ধ করতে চায় আমেরিকার করদাতাদের টাকা আত্মসাৎ করে। আর এই অস্ত্র-লবির উপর নেতানিয়াহুর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। কিন্তু আমেরিকা এবং পশ্চিমাদেশগুলোর সাধারণ মানুষ যুদ্ধের বিরুদ্ধে লাগাতার রাস্তায় নেমেছে গত দু’বছর ধরেই, এখনও তারা রাস্তায়ই।

ইজরায়েল হল আমেরিকা আর বৃটেনের এক অবৈধ সন্তান যাকে মধ্যপ্রাচ্যে জন্ম দেওয়া হয়েছে সারা পৃথিবীর প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ তেলের ভান্ডারের উপর কর্তৃত্ব রাখার জন্য। সৌদি আরবের সঙ্গে পেট্রো-ডলার চুক্তির মারফত আমেরিকা একটা সময় সারা বিশ্বের উপরেই নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। বিংশ শতকের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে আরব জনগণের মধ্যে ঐক্য ও স্বায়ত্ত্বশাসনের আকাঙ্ক্ষা থেকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগঠিত হয়, যা আরব জাতীয়তাবাদ নামে পরিচিত। ইজরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম ও প্যালেস্টাইন সমস্যা ধর্মনিরপেক্ষ আরব জাতীয়তাবাদকে ইসলামিক জাতীয়তাবাদে পরিণত করে। সদ্য স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্রগুলিকে রাশিয়ার প্রভাব থেকে দূরে রাখতে এবং অস্থিতিশীলতাকে স্থায়ী রূপ দিতে আমেরিকা এবং ইজরায়েল মিলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী উগ্রপন্থী দলের জন্ম দেয় মধ্যপ্রাচ্যে, যা আমেরিকা-ইউরোপের অস্ত্র ব্যবসাকে শক্তিশালী করে। এরপরেও সাতটি দেশের কোথাও সার্বভৌমত্বকে ভাঙতে বা কোথাও প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠের জন্য জনগণের সরকার ভেঙে নিজেদের পছন্দ মতো লোক বসানোর পরিকল্পনা হয়। সাদ্দাম, গদ্দাফি যার বলি হন। এরমধ্যে সপ্তম দেশটি হল ইরান। এবার ইরানের পালা এসেছে।

পাহাড় দিয়ে ঘেরা ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এমনই যে এটি পূর্ব-পশ্চিম এবং উত্তর-দক্ষিণকে সংযুক্ত করে, সাতটি দেশের সঙ্গে সীমানা ভাগ করে। কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা গাল্ফ উপসাগরের প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালী দিয়ে সারা বিশ্বের প্রতিদিনের জ্বালানী তেলের ২০ শতাংশ পরিবাহিত  হয়। এটি বিশ্বের অর্থনৈতিক ধমনীর মতো। আমেরিকার হামলার পর প্রত্যুত্তর হিসাবে ইরান তা  বন্ধ করে  দিতে চাইছে। ইরান, চীনের তেলের প্রধান যোগানদার। ইরানকে হাতের মুঠোয় আনা গেলে ইয়েমেনের হুতি, হিজবুল্লাহ, হামাস এদেরও নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলা সম্ভব। হুতি নিয়ন্ত্রণে আসলে রেড-সি এবং সুয়েজ ক্যানেল দিয়ে বাণিজ্য অনেক সহজ হবে। অর্থাৎ ইরানকে কব্জা করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের ব-কলম সাম্রাজ্যটা ভালো ভাবে গোছানো হয়। চীন-রাশিয়ার ব্রিক্স সম্প্রসারণকেও আটকানো সম্ভব হয়। এরকম একটি অঞ্চলে আমেরিকার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হলে তা চীন-রাশিয়ার জন্যও একেবারে সুবিধাজনক হবে না। চীন-রাশিয়া তাই পক্ষ নিতে বাধ্য হয়েছে।

ইরান কী করে লড়ছে? ইরান বিগত চল্লিশ বছর ধরে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে একটু একটু করে নিজেকে গড়ে তুলেছে। ইরানে শিক্ষার হার ৯০ শতাংশ। মেয়েরা শিক্ষার হারে সামান্য হলেও এগিয়ে আছে। রিসার্চ এন্ড ডেভালপমেন্টে চলতি বছরের বাজেট জিডিপির ৪ শতাংশ, যা আমেরিকা এবং চীনের থেকে বেশি। খাদ্য উৎপাদনে প্রায় স্বনির্ভর। প্রায় ২৫০০ বছরের একটি লিখিত ইতিহাস আছে ইরানের। শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে একটি স্বাভাবিক বন্ধন গড়ে তোলে। সমস্যা আছে। বামপন্থী মুক্তচিন্তার মানুষরা হয় মৃত্যুদন্ড পেয়েছে নয়তো দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তানের যুদ্ধে গৃহহীন অনেক মানুষ আশ্রয় পেয়েছে ইরানে, মোসাদ যাদের ফাঁদে ফেলে কাজে লাগায়। তাদেরই কয়েকজনের ফাঁসি হয়েছে ইজরায়েল আক্রমণ করার দুদিনের মধ্যে। আর ইরানের  নারীদের হিজাব-বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে বোধহয় পশ্চিমা মিডিয়ার দৌলতে আমরা সকলেই পরিচিত। তবুও ইসলামিক জাতীয়তাবাদ দেশটিতে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একটি জনমত গড়ে তুলতে পেরেছে। ইরান এই যুদ্ধ শুধু নিজের জন্য লড়ছে না। ইরান লড়ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সমগ্র মুসলিম সমাজের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে, লড়ছে গাজায় মৃত প্রতিটি শিশুর জন্য। বিপুল জনসমর্থনের সঙ্গে ইরানের মিসাইল গবেষণা, চীনের অস্ত্র এবং রাশিয়ার প্রযুক্তি-সাহায্য এই যুদ্ধের অন্যতম হাতিয়ার। চীন যে আমেরিকা বা পশ্চিম ইউরোপের থেকে উন্নত মিসাইল বানাতে সক্ষম হয়েছে তার প্রমাণ ইজরায়েলের এফ৩৫ এবং ভারতের রাফাল ভূপতিত হওয়া। অস্ত্রের বাজারে চীনের উত্থান দেখিয়ে দেয় বৃহৎ শক্তি হিসাবে তার বিকশিত হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।

এই চীনকে আটকাতে মরিয়া আমেরিকা। মরিয়া আরও একটি কারণে। আগামীদিনের জ্বালানী হতে চলা বিরল খনিজের মজুত ভান্ডার হিসাবে চীন আছে সবার উপরে। আর ব্রিক্সের সদস্য দেশগুলির সুবাদে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ বিরল খনিজের উপর চীনের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তাই চীনকে আটকাতে যেমন ইরানে আধিপত্য বিস্তার করা দরকার তেমনি মায়ানমার, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ভারতের সেভেন সিস্টারস দিয়ে চীনকে ঘেরাটা দরকার। সেই লক্ষ্যে কাজও এগোচ্ছে। চীনও বেল্ট এন্ড রোড ইনিসিয়েটিভ নিয়ে বিকল্প বাণিজ্য পথ নির্মাণ করছে। আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ থাকা মালাক্কা প্রণালীকে এড়ানোর জন্য রাখাইন এবং হাম্বানটোটা বন্দরকে বিকল্প হিসাবে ভাবছে। অর্থাৎ প্রকৃত লড়াইটা আমেরিকা আর চীনের ভিতরে। তাহলে ইজরায়েল কেন হঠাৎ ইরানের উপর ঝাঁপাতে গেল?

সেটা বোঝার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের শেষ পরিক্রমণটা যদি দেখি তাহলে দেখব ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকদিন ধরে ঘুরে বেড়ালেন কিন্তু নেতিনেয়াহুর সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করলেন না। ইরানের সঙ্গে পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে কথা-বার্তা এগোচ্ছিল। আমেরিকার ডিএনআই তুলসী গ্যাবার্ড বলেও দেন যে ইরান এখনও পরমাণু বোমা তৈরি থেকে অনেকটা দূরে। যদি এই ডিলটা হয়েই যেত তাহলে এমন হতেই পারত যে, ইজরায়েলকে আমেরিকার আর বিশেষ প্রয়োজন হত না মধ্যপ্রাচ্য সামলানোর জন্য। তখন মধ্যপ্রাচ্য ইজরায়েলের জন্য মোটেই আর নিরাপদ থাকবে না। আর খনিজ তেলের উপর নির্ভরতা গোটা বিশ্বকেই ক্রমশ কমিয়ে আনতে হবে। বরং মধ্যপ্রাচ্যকে আগামীদিনে ভালো ডোমেস্টিক বাজার হিসাবে দেখা যেতে পারে। তখন অস্ত্র ব্যবসার কেন্দ্রটা ঘুরে আসবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে। অস্ত্র ব্যবসা মানে অস্ত্রের প্রয়োগ। ভেবে দেখলে প্রায় ৭০-৭৫ বছর ধরে পুঁজিবাদের অভিশাপটা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ বুক পেতে নিচ্ছে। এরপর হয়তো আমাদের পালা আসবে।

পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে পুঁজি সব সময় তার কেন্দ্র বদল করেছে। লাতিন আমেরিকা থেকে লুঠ করা স্পেনের সোনা বাণিজ্যের মাধ্যমে একটা সময় চলে গেছে ফ্রান্স আর বৃটেনে। ফ্রান্সে হয়েছে বুর্জোয়া বিপ্লব, বৃটেনে হয়েছে শিল্প বিপ্লব। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লব হয়েছে রাশিয়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের পর পুঁজি বৃটেন থেকে কেন্দ্র পরিবর্তন করে গেছে আমেরিকায়, এই পরিবর্তনপর্বকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লব হয়েছে চীনে। এখন আবার একটা পরিবর্তন হতে চলেছে। চীন নতুন কেন্দ্র হিসাবে উঠে আসছে। ব্রিক্স তার নিজস্ব মুদ্রা চালু করার পথে। শক্তিশালী হবে ব্রিক্সভুক্ত সকল দেশের মুদ্রামান। ডলার পড়বে। আমেরিকার সেনেটের এক অংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও ইজরায়েল সফল হয়েছে আমেরিকাকে যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি টেনে আনতে। হয়তো বিশ্ব একটি দীর্ঘ এবং সর্বনাশা যুদ্ধের দিকেই এগোচ্ছে।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির রাজনৈতিক গতিপথ তাহলে কী হতে পারে বা হওয়া সম্ভব? পুঁজির গভীর সঙ্কট আমেরিকা, ইউরোপ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির গতিপথে একধরনের ফ্যাসিবাদী প্রবণতার জন্ম দিয়েছে। এই ফ্যাসিবাদী প্রবণতাটা আগের ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদ থেকে ভীষণ আলাদা। আমাদের দেশে দলিত, আদিবাসী ও শ্রমজীবী মুসলিম মানুষ অত্যাচারের নিশানায় যেখানে উচ্চবিত্ত মুসলিমের সঙ্গে হিন্দু বিজেপি নেতাদের সন্তানদের বৈবাহিক সম্পর্কও মঞ্জুর হয়ে যায়। ইউরোপ-আমেরিকায় শ্রমজীবী অভিবাসীর উপর আঘাত নেমে আসে কিন্তু হোয়াইট কলার ইন্টেলিজেন্ট অভিবাসী নিরাপদে থাকে। কারণ ইন্টেলিজেন্স এখন পুঁজি বৃদ্ধির হাতিয়ার। এই সব কিছু থেকে যে চিত্রটা পরিষ্কার হচ্ছে তা হল সারা দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষ বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। আসলে প্রযুক্তির বিকাশ এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে, এখন উৎপাদিকা শক্তির সামাজিক হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন শুধু বিপ্লবী কবি সুকান্তর ছোট্ট একটা ‘দেশলাই কাঠি’। আমরা যদি প্রত্যেকে এক একটি দেশলাই কাঠি হয়ে এক সঙ্গে জ্বলে উঠতে পারি তবে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস অনিবার্য। আর এই দেশলাই কাঠি তৈরির পদ্ধতিটা বলে গেছেন মার্কস-এঙ্গেলস। কারিগরদের এগিয়ে আসতে হবে, আজকের প্রাসঙ্গিকতায় পদ্ধতিটাকে নতুন করে ভাবতে হবে, কাজে নামতে হবে, না হলে আগামীদিনে অশান্ত হয়ে উঠবে এই ভারতীয় উপমহাদেশ।

The post মধ্যপ্রাচ্যেই কি হবে আমেরিকা- সাম্রাজ্যবাদের কবর? appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/society/will-the-middle-east-be-the-grave-of-american-imperialism/feed/ 1 3255
ট্রাম্পের নীতিহীনতা ও ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া: একটি বিশ্লেষণ https://pariprashna.in/article/society/trumps-unethical-behavior-and-the-indian-governments-response-an-analysis/ https://pariprashna.in/article/society/trumps-unethical-behavior-and-the-indian-governments-response-an-analysis/#respond Mon, 16 Jun 2025 06:39:06 +0000 https://pariprashna.in/?p=3247 আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে গিয়ে ভারতে রপ্তানির উপর উচ্চ শুল্ক বসিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  বর্তমান এই রাষ্ট্রপতি। ট্রাম্পের শুল্কনীতির মূল লক্ষ্য হল মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা, যা আবার  ভারতের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। মার্কিন রপ্তানি বাড়াতে ভারতকে তার বাজার খুলে দিতে হবে, যা ভারতীয় উৎপাদকদের জন্য বিপদের এক সংকেত।

The post ট্রাম্পের নীতিহীনতা ও ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া: একটি বিশ্লেষণ appeared first on Pariprashna.

]]>
বঙ্কিম দত্ত

আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প  অতি সম্প্রতি অভিবাসী ভারতীয়দের হাতকড়া বেঁধে অপমানজনক ও অমানবিকভাবে দেশে ফেরত পাঠিয়েছেন । সম্প্রতিক যুদ্ধের সময়ও ভারতের বিরুদ্ধে কটূক্তি করেছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য  ভারতকে বাধ্য করেছেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে গিয়ে ভারতে রপ্তানির উপর উচ্চ শুল্ক বসিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  বর্তমান এই রাষ্ট্রপতি। ট্রাম্পের শুল্কনীতির মূল লক্ষ্য হল মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা, যা আবার  ভারতের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। মার্কিন রপ্তানি বাড়াতে ভারতকে তার বাজার খুলে দিতে হবে, যা ভারতীয় উৎপাদকদের জন্য বিপদের এক সংকেত।ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত (trade surplus) কমাতে চাইছে এবং এজন্য অন্যান্য দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্য, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির পরিকল্পনা করছে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় “ভারতীয় শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এমন ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে উৎসাহিত করেছে, যেখানে চীন বা অন্যান্য দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা যেতে পারে”। কৃষিখাতে মার্কিন ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্য আমদানি করলে লক্ষ লক্ষ কৃষকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

কোনও কড়া ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, ভারত সরকার  এই বিষয়গুলিতে ট্রাম্পের সমালোচনাও করেনি ; শুধু বলেছে যে তারা মার্কিন পদক্ষেপগুলি “পর্যালোচনা করছে” এবং একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির জন্য আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখে।কোয়াড (QUAD)-এর মাধ্যমে (যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া) চীনের প্রভাব মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ছে। ফলে অন্যদিকে   ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েন এতে বাড়ছে ।

ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে Apache হেলিকপ্টার, P-8I পোসাইডন নৌবিমান, S-400 মিসাইল সিস্টেম ইত্যাদি উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করছে । দুই দেশ লজিস্টিক্স এক্সচেঞ্জ অ্যাগ্রিমেন্ট (LEMOA) এবং কমিউনিকেশন কম্প্যাটিবিলিটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাগ্রিমেন্ট (COMCASA)-এর মতো চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি, যা দুই দেশের মধ্যে সামরিক যোগাযোগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতাকে সুদৃঢ় করে।COMCASA শুধু একটি চুক্তি নয়, এটি ২১শ শতকের ভারত-মার্কিন জোটের রূপান্তরকারী অধ্যায় । ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিস-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় এই চুক্তি। যৌথ সামরিক অনুশীলন যেমন, মালাবার নৌ মহড়া, যুদ্ধ মহড়াও  নিয়মিত হচ্ছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এই চুক্তি ভারতের সামরিক স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডেটা অ্যাক্সেস ও ব্যবহারে শর্ত আরোপ করতে পারে। যেমন, যদি ভারত রাশিয়া বা ইরানের সাথে কোনো যৌথ মহড়া চালায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডেটা শেয়ারিং বন্ধ করে দিতে পারে। সমর-বিশেষজ্ঞদের মতে এই চুক্তি দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে।

যিনি ভারতের ইতিহাস ও রাজনৈতিক-অর্থনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল  নয়, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের প্রতি ভারত সরকারের নরম প্রতিক্রিয়া তার কাছে  রহস্যজনক মনে হতে পারে। অথচ ট্রাম্প বারবারই ভারতকে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের  ক্ষেত্রে “অত্যাধিক  রকমের নিয়মভঙ্গকারী” বলে আখ্যায়িত করে থাকেন।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে আলোচনার টেবিলে ভারত সম্পর্কে তীব্র সমালোচনামূলক মন্তব্য করতে দ্বিধা করে না । 

সাম্প্রতিককালে ভারতের এই নমনীয়তা বেশী রকমের ব্যতিক্রমী। ভারতের শাসকগোষ্ঠী এই মুহূর্তে অর্থনীতির দিক দিয়ে ও কৌশলগতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে যা এযাবত স্পষ্ট ভারতের বিদেশ-নীতিতে উল্টোরথের টান। ভারতের শাসকশ্রেণি ট্রাম্পের পদক্ষেপের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে চিন্তিত নয়; বরং তারা মনে করছে, ট্রাম্পের নীতির ফলে ভারত লাভবান হতে পারে, কারণ চীন বা অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতকে কম চাঁদমারি করা হচ্ছে। অ্যাপেলের আইফোনের মতো পণ্য রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা ও শেয়ার বাজারের উল্লম্ফন নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া  আশাবাদ ছড়াচ্ছে।

 “নতুন ভারত“-এর স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে 

গত কয়েক বছরে ভারতের একটি আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পশ্চিমাদেশেগুলির শ্রোতাদের সামনে ভারতের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন। ভারতকে “বহুপাক্ষিক বিশ্বের উদীয়মান শক্তি” যা NATO-র মতো জোটে যোগ দেবে না এই হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, জোরের সঙ্গে অর্থনীতিতে “আত্মনির্ভর ভারত” (Atmanirbhar Bharat) এর কথা বলা হয়েছে, রুপিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভারতের শিল্পপতি আদানি মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোস, মার্কিন ইক্যুইটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিন্ডেনবার্গ এবং মার্কিন বিচার বিভাগের সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করে প্রায় অক্ষত অবস্থায় উতরে যান। যুক্তরাষ্ট্রের বারংবার মৌখিক ভর্ৎসনার পরও ভারত রাশিয়া থেকে ব্যাপক হারে তেল আমদানি অব্যাহত রাখে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI), রুপিতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের একটি পদ্ধতি চালু করে এবং ২০২১ সালে ঘোষণা করেন : “ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ভারতীয় রুপি-র উত্থান অনিবার্য”।

আমাদের দেশের মানুষকে জানানো হয়েছিল, সময় এখন ভারতের।  ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ২০২৩ সালে প্রাধানমন্ত্রী মোদির সাক্ষাৎকার নেয়।  “বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের  ভূমিকা থেকে শুরু করে বিশ্ব- অর্থনীতিতে তার অবদান—এই দেশটির সময় এসে গেছে” এই ছিল সাক্ষাৎকারের  সামগ্রিক বার্তা। কিছুই ভারতের উত্থান থামাতে পারবে না, বলেছিলেন এস. জয়শঙ্কর: “আজ ভারত বিশ্বের মধ্যে তার স্থান নিচ্ছে এবং তা এমন কিছুর জন্য, যার জন্য সমস্ত ভারতীয়র গর্বিত হওয়া উচিত…। এটা খুবই পরিষ্কার, ভারতের উত্থান অপ্রতিরোধ্য।”

ভারতের শীর্ষস্থানীয় পুঁজিপতিরাও একমত হয়েছেন যে, এখন ভারতের সময়। মুকেশ অম্বানি বলেছিলেন, “নতুন ভারতের উত্থান নিয়ে আমি অত্যন্ত আশাবাদী এবং আত্মবিশ্বাসী। আমি দেখতে পাচ্ছি ভারতের আত্মা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জাগ্রত… একটিই কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়: ভারতের সময় এসে গেছে।”  শিল্পপতি গৌতম আদানিও একমত: “একটি গণতন্ত্রের সময় এসে গেলে তাকে আর কেউ থামাতে পারে না, আর ভারতের সময় এসে গেছে।” শুধু সময় নয়, আনন্দ মাহিন্দ্রা ঘোষণা করলেন, “এটি ভারতের শতক হতে পারে।” মার্কিন পরামর্শদাতা সংস্থা ম্যাকিন্সে নিশ্চিত করে বলেছে, “এটি শুধু ভারতের দশকই নয়, বরং ভারতের শতক হবে।” লন্ডনভিত্তিক সেন্টার ফর ইকনমিক্স অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ আমাদের জানিয়েছে, শতকের শেষে ভারত হবে “বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার”—একটি পূর্বাভাস যার সত্যতা যাচাই করা যাবে আজ থেকে ৭৫ বছর পরে।

কিন্তু ২০২৫ সালে ট্রাম্পের পদক্ষেপের মুখে এই দাবিগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।   শেকল পরানো অবস্থায় ভারতীয় অভিবাসীদের, সামরিক বিমানে করে, অপমানজনক দেশান্তরের ভিডিও প্রকাশ করে মার্কিন সীমান্ত পুলিশ। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর এটিকে “স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর” বলে উড়িয়ে দেন। ট্রাম্প BRICS দেশগুলিকে হুমকি দিয়েছেন, ডলারকে চ্যালেঞ্জ করলে ১০০-১৫০% শুল্ক বসানো হবে। জয়শঙ্কর লন্ডনে বলেছেন, “আমাদের ডলারকে প্রতিস্থাপনের কোনও ইচ্ছা নেই।” আবার ভারত মার্কিন পারমাণবিক রিয়্যাক্টর সরবরাহকারীদের দুর্ঘটনার দায়মুক্তি দিয়েছে, আমদানি শুল্ক কমিয়েছে।  ভারত আরেকটি একতরফা ছাড়  ‘গুগল ট্যাক্স’ আমেরিকার জন্য দেয় (গুগল ট্যাক্স একটি অপ্রত্যক্ষ কর, যা মূলত ডিজিটাল অর্থনীতিতে কর্মরত বহুজাতিক কোম্পানিগুলির যেমন গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজন ইত্যাদি দ্বারা স্থানীয় দেশে আয়কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা রোধ করতে আরোপ করা হয়। এটি ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স (DST)বা ইক্যুয়ালাইজেশন লেভি নামেও পরিচিত)। কর ছিল মাত্র ৬ শতাংশ, আর তা আরোপিত হয়েছিল এমন বিদেশি কোম্পানিগুলোর উপর, যাদের ভারতে কোনও প্রত্যক্ষ উপস্থিতি নেই, কিন্তু যাদের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন থেকে আয় হয় এবং যাদেরকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা অনলাইন বিজ্ঞাপনের জন্য এক লক্ষ কোটি টাকা (এক ট্রিলিয়ন টাকা) এর বেশি পরিমাণ অর্থ প্রদান করে। এই কর বাতিলের মূল সুবিধাভোগী হল বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী গুগল ও ফেসবুক (মেটা), যারা ভারতের অনলাইন বিজ্ঞাপন বাজারে প্রভাবশালী; বর্তমানে অনলাইন বিজ্ঞাপনই ভারতের বিজ্ঞাপন আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ। যুক্তরাষ্ট্র এটিকে “বৈষম্যমূলক কর” বলে মনে করে।  এই ট্যাক্স বাতিল করার ঘটনা কোনও আলোচনার অংশ হিসেবে ঘটেনি, বরং এটি ছিল ভারত সরকারের একতরফা ছাড়—মার্কিন কর্পোরেশনগুলোর জন্য একপ্রকার নিখাদ উপহার।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে গুগল ও ফেসবুক ট্রাম্পের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত; সেই প্রেক্ষিতে, ট্রাম্পের অনুগতদের প্রতি এমন উপহার ট্রাম্পের মন জয় করারই কৌশল।  কারণ তা সরাসরি ট্রাম্পের সমর্থক কোম্পানিগুলিকে উপকৃত করে।  

ভারতের  কেন্দ্রীয়  সরকারের  মতে, ট্রাম্পের নীতির সুবিধা হলো: 

১.রপ্তানির সুযোগ: চীন ও অন্যান্য প্রতিযোগীদের উপর উচ্চ শুল্কের কারণে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা বাড়তে পারে। 

২.বিনিয়োগ বৃদ্ধি: বহুজাতিক কোম্পানিগুলি চীন ছেড়ে ভারতে উৎপাদন শুরু করতে পারে (যেমন অ্যাপল ইতিমধ্যেই আইফোন অ্যাসেম্বলি চীন থেকে ভারতে সরিয়ে নিয়েছে)। 

কিন্তু সমস্যা হলো: 

– মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় তার বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে, তাই ভারতকে আরও আমদানি করতে হবে। এর অর্থ ভারতীয় বাজার থেকে স্থানীয় উৎপাদকদের উৎখাত। 

– কৃষি খাতে আমদানি বাড়লে কৃষকদের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। 

– চীনের সাথে বাণিজ্য বিঘ্নিত হলে ওষুধশিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংকট দেখা দেবে। 

 শ্রেণিগত স্বার্থ 

ভারতের শাসকশ্রেণি ঐতিহাসিকভাবে ব্যবসায়িক ও আমলাতান্ত্রিক স্বার্থে প্রভাবিত। তারা স্বাধীনতার পরও ঔপনিবেশিক কাঠামো ভাঙেনি, জমি সংস্কার বা গণমুখী শিল্পায়ন ঘটেনি। বড় পুঁজিপতিরা প্রায়শই   বিদেশি পুঁজির সাথে সহযোগিতা করে লাভবান হয়েছে, তাদের কৌশল হল মার্কিন জোটের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করা, যদিও তা সাধারণ মানুষের জন্য ক্ষতিকর। 

শেষ কথা 

ভারতের শাসকগোষ্ঠীর এই নীতি দেশের জন্য অযৌক্তিক, কিন্তু তাদের শ্রেণিগত স্বার্থে যৌক্তিক। রপ্তানি নির্ভরতা বৃদ্ধির পরিবর্তে ভারতের আসল প্রয়োজন হল কৃষি সংস্কার, মজুরি বৃদ্ধি,  গণ ও পরিবেশমুখী শিল্পায়নের মাধ্যমে  দেশের আভ্যন্তরীণ  বাজারের প্রসার। কিন্তু এই পথে হাঁটার মতো রাজনৈতিক ইচ্ছা বা শ্রেণিশক্তি এখনও ভারতের ক্ষমতায় নেই।তবে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলি ‘China Plus One’(চীনের বিকল্প নয়, চীনের পাশাপাশি ‘সহনীয় বিকল্প’ তৈরি করা) কৌশল ভারত ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরি করেছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত ও প্রযুক্তিনির্ভর অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। ২১শ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক পরিসরে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক একটি নতুন মোড় নেয়। এই সম্পর্কের অন্যতম স্তম্ভ হলো আমেরিকার কর্পোরেট পুঁজির ভারত অভিমুখী স্রোত। Apple, Google, Amazon-এর মতো বহুজাতিক কর্পোরেশন এখন ভারতের শ্রমবাজার, উৎপাদন ক্ষমতা ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া এক অর্থে ট্রাম্প প্রশাসনের “America First” অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে একটি মৌলিক দ্বন্দ্বও সৃষ্টি করে—যেখানে দেশীয় উৎপাদন ও চাকরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। যদিও বাস্তবায়নে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ আছে, তবু যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেট মহল ভারতের উপর আস্থা রাখতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক বিশ্ব উৎপাদন চেইনের ভারসাম্য পরিবর্তনে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছে অর্থনৈতিক মহল।একাধিক প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার, বিপুল সস্তা শ্রমশক্তি, দ্রুত বর্ধনশীল মধ্যবিত্ত বাজার, তরুণ জনসংখ্যা ও ডিজিটাল সক্ষমতা—সবকটিই ভারতকে কর্পোরেটদের পছন্দের তালিকায় এগিয়ে রাখছে।প্রসঙ্গত বলা যায় আগামীদিনের বিদ্যুৎ  শক্তি উৎপাদনের প্রধান উৎস ‘বিরল মৃত্তিকা মৌল’-এর আকরিকে ভারত যথেষ্ট সমৃদ্ধ(চীন ও ব্রাজিলের পর তৃতীয় স্থানে)। এই  প্রেক্ষাপটে ভারতও নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে।ঘটনা পরম্পরাগতভাবে স্পষ্ট হচ্ছে যে পুঁজি বিনিয়োগ কেন্দ্রের আমেরিকা থেকে দেশান্তরী যাত্রা  পুঁজিবাদের ‘নিয়তি-নির্দ্দিষ্ট’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে যেমন তা ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় সরে গিয়েছিল, এখন তা চীন অভিসারী। এখানেই ভারতের অংশীদারত্বের আকাঙ্ক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের চীন+১ নীতি তার সহায়ক। আশা বা আশঙ্কা যাই বলা হোক না কেন একথা নিশ্চিত যে শ্রম আইন,  খণিজ আইন, বন আইন, জীববৈচিত্র্য আইন ও একাধিক পরিবেশ আইনের পরিবর্তন এই কারণে যাতে সংবিধানের আওতার মধ্যেই চুড়ান্তভাবে  শ্রম ও পরিবেশ শোষনের ফ্যাসিস্ট কায়দা রাষ্ট্র কর্পোরেট স্বার্থে চালাতে পারে।এর অতিরিক্ত জনতার ক্ষোভ-বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার জন্য রইল রাষ্ট্র অনুসারী দল ও তার সামাজিক ও দার্শনিক উপাঙ্গগুলি। সর্বোপরি রইল হরেক কিসিমের বিভাজনের মতাদর্শ ও সামাজিক সম্মতি আদায়ের লক্ষ্যে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত অক্লান্ত গণমাধ্যমগুলি।  কর্পোরেট আদানি-আম্বানি গোষ্ঠীর “ভারতের সময় এসে গেছে” ঘোষণা ‘সুপার প্রফিট’এর পুতিগন্ধময় একথা তো স্পষ্টই। আমজনতাকে চূড়ান্ত শোষনের এই কর্পোরেট আয়োজনে দেশীয় শরিকরা ‘ছোট বটে তবু তোমার জগতে’ আমাদেরও লাভ আছে বলে নেমে পড়ার জন্য প্রস্তুত।   যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ পাকিয়ে তুলে আমেরিকা ও প্রধানত পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো পুঁজির এই দেশান্তর আটকানোর চেষ্টা করছে। এই চেষ্টার ব্যর্থতাও ‘নিয়তি নির্দ্দিষ্ট’।তবে অবাধ প্রকৃতি লুন্ঠন, চূড়ান্ত শ্রম-শোষন আর কর্পোরেট সুপার প্রফিটের ত্রহ্যস্পর্শযোগে দেশের মানুষের কষ্ট বাড়বে বৈ কমবে না (উবের, সুইগি, জোমাটো ইত্যাদি তুলনীয়)। শ্রম ও প্রকৃতি শোষণের  এক ভয়ংকর আসন্ন আগামীর বিরুদ্ধে দেশে-দেশে নারী আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন, লিঙ্গ সমতার আন্দোলন, বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলন, আদিবাসী আন্দোলন ইত্যাদি  গড়ে উঠছে। কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধতা গড়ে উঠছে এইসব আন্দোলনের। বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক দিশায় পরিচালিত সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ফিরছে। যোগাযোগের মাধ্যমগুলির ব্যবহারের সুযোগে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী ঐক্য গড়ে উঠছে। আশ্বাস এখানেই।

সৌজন্য: রিসার্চ ইউনিট ফর পলিটিক্যাল ইকোনমি (RUPE)।

The post ট্রাম্পের নীতিহীনতা ও ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া: একটি বিশ্লেষণ appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/society/trumps-unethical-behavior-and-the-indian-governments-response-an-analysis/feed/ 0 3247
আল্পস পর্বতমালায় ভয়াবহ হিমবাহ ধস একটি গ্রামকে নিশ্চিহ্ন করে দিল: শিখিয়ে দিয়ে গেল অনেক কিছু https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/alps-glacier-collapse-destroys-village-warning-on-climate/ https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/alps-glacier-collapse-destroys-village-warning-on-climate/#respond Sun, 01 Jun 2025 20:16:43 +0000 https://pariprashna.in/?p=3238 একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ায় ২ কিমি দীর্ঘ, ২০০ মিটার প্রশস্ত এবং ২০০ মিটার গভীর এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ঘটনার সময় একটি ৩.১ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য কম্পন রেকর্ড করা হয়। ফলাফল? গ্রামটির ৯০ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

The post আল্পস পর্বতমালায় ভয়াবহ হিমবাহ ধস একটি গ্রামকে নিশ্চিহ্ন করে দিল: শিখিয়ে দিয়ে গেল অনেক কিছু appeared first on Pariprashna.

]]>
সন্তোষ সেন

২৮ মে, ২০২৫: সুইজারল্যান্ডের ভ্যালাইস ক্যান্টনের ব্লাটেন (Blatten) গ্রামে একটি ভয়াবহ হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। আল্পস পর্বতমালায় সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ, এই হিমবাহ ধসের ফলে একটি গ্রাম সুইজারল্যান্ডের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেল। হ্যাঁ, গ্রামটি নেই হয়ে গেছে।

ঘটনা প্রবাহ : আল্পস পর্বতের বার্চ হিমবাহের

একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ায় ২ কিমি দীর্ঘ, ২০০ মিটার প্রশস্ত এবং ২০০ মিটার গভীর এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ঘটনার সময় একটি ৩.১ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য কম্পন রেকর্ড করা হয়। ফলাফল? গ্রামটির ৯০ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
হিমবাহে ফাটল দেখা দেওয়ার পর ১৯ মে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামটিকে সম্পূর্ণভাবে খালি করে দেওয়া হয়। পাহাড়ের কোলে ছবির মতো সাজানো নৈসর্গিক ব্লাটেন গ্রামের ৩০০ জন বাসিন্দা এবং গবাদি পশুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় ঠিকই। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষে উদ্ধার অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

পাহাড় থেকে ধসে পড়া বরফ, কাদা ও পাথরের কারণে লোনজা নদী সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে একটি অস্থায়ী হ্রদের জন্ম দিয়েছে। ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল! নাকি জীবনের স্পন্দন সহ একটি সুন্দর ছোট আস্ত নদী ছিল, পাল্টে গেল একটি ভয়ানক হ্রদে! যে হ্রদে প্রতি ঘণ্টায় ৮০ সেন্টিমিটার হারে বরফগলা জল জমা হচ্ছে। মানে বিগত চার দিনে হ্রদের জলস্তর তিন মিটারের বেশি বেড়ে গেছে। এতে নিচু এলাকার গ্রামগুলিতে বন্যার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গাম্পেল ও স্টেগ গ্রামগুলি থেকে মানুষজনকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এ কি নেহাতই প্রাকৃতিক দূর্যোগ?

কেন এইসব দুর্যোগ দুর্বিপাক বাড়ছে প্রতিদিন বিশ্বের কোন না কোন প্রান্তে? দেশ বিদেশের এক বড় অংশের বিজ্ঞানীরা বলছেন –ধসের পিছনের মূল কারণ হল অপরিমিত হারে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, তথাকথিত অব-উন্নয়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং এসবের ফলস্বরূপ বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রার বৃদ্ধি ও
জলবায়ুর পরিবর্তন। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আল্পস পর্বতমালার হিমবাহও গলছে অতি দ্রুত হারে। পারমাফ্রস্ট (শুকনো বরফের স্তূপ) দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা পাহাড়ের স্থিতিশীলতা হ্রাস করছে। সুইজারল্যান্ডে ২০২২ সালে হিমবাহের আয়তন ছিল ৬%। অথচ ২০২৩ সালে তা ৪% হ্রাস পেয়ে এখন তলানিতে ঠেকেছে।বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন এই হারে চলতে থাকলে শতাব্দীর শেষে আল্পসের অধিকাংশ হিমবাহ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
ব্লাটেনের মেয়র বলেছেন, “আমরা আমাদের গ্রাম হারিয়েছি, কিন্তু আমাদের জীবন নয়।” তিনি পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। সুইস সেনাবাহিনী উদ্ধার ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে সহায়তা করছে। অর্থ, প্রশাসনিক তৎপরতা আর সামরিক ক্ষমতার সাহায্যে হারিয়ে যাওয়া গ্রামকে হয়তো বা আবার ফিরিয়ে আনা যাবে। কিন্তু অর্থের গর্বে দর্পি মানুষ, উন্নত মস্তিষ্কের দাবিদার হে মহামানব তুমি কি পারবে আর একটি হিমবাহ প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিতে? কোন্ ক্ষমতার ঐশ্বর্যে তুমি তৈরি করে দিতে পারবে একটি, মাত্র একটি পাহাড়, সমুদ্র বা ধ্বংস করে দেওয়া প্রাকৃতিক জঙ্গলকে? ফিরে আসি, আল্পস পর্বত সহ সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষেত্রে পার্মাফ্রস্টের অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক অবদানের বিষয়ে।

পার্মাফ্রস্ট পরিবেশের এক জমাটবাঁধা সংকেত:

পার্মাফ্রস্ট মূলত পাথর, পাহাড় ধসের মাটি (মোরেইন) এবং বরফের সংমিশ্রণে তৈরি একটি ভূমিস্তর। যা বরফে আচ্ছাদিত প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপটকে একত্রে ধরে রাখে। পার্মাফ্রস্ট শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে হিমায়িত অবস্থায় হাজার লক্ষ বছর ধরে টিকে আছে। এটি পৃথিবীর প্রায় ১১% ভূমি জুড়ে বিস্তৃত এবং মুলত দেখা যায় আর্কটিক, সাব-আর্কটিক বিশেষ করে কানাডা ও রাশিয়ার মেরু অঞ্চলে এবং উচ্চ পর্বতশ্রেণিগুলিতে। সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার ৩-৫% এলাকা পার্মাফ্রস্টে আবৃত। এটি থাকে মূলত ২,৬০০ মিটার বা তার ঊর্ধ্বের উচ্চতায়, ভূমির নিচে লুকিয়ে থাকা এই স্তর অনেক সময় চোখে পড়েনা, কিন্তু এর প্রভাব সর্বব্যাপী।

কিন্তু পৃথিবীবাসীর দুর্ভাগ্য, ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন জমাটবাঁধা এই স্তর।
পার্মাফ্রস্টের গলন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়িয়ে দিতে সহায়ক। সুইজারল্যান্ড সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পার্মাফ্রস্ট নিয়ে গবেষণার অগ্রগতি আমাদের এই বাস্তবতা সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি এনে দিচ্ছে।

সুইজারল্যান্ডে পার্মাফ্রস্ট গলার বর্তমান অবস্থা:

সুইস গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘Permafrost Monitoring Network’ গত ২০ বছর ধরে ৩০টি সাইটে পার্মাফ্রস্ট পর্যবেক্ষণ করছে। এই গবেষণায় ইউরোপের ৯টি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। আর্কটিক বৃত্তের কাছের সভালবার্ড থেকে শুরু করে আল্পস এবং স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলের সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালা পর্যন্ত। গবেষণায় জানা গেছে, পার্মাফ্রস্টের তাপমাত্রা পৌঁছেছে রেকর্ড উচ্চতায়। ফলে বরফের স্তরের পুরুত্ব এবং পাথর-গ্লেসিয়ার অতীতের চেয়ে অনেক বেশি গতিতে সরে সরে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ‘Nature’ জার্নালে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১০ বছরে ১০ মিটার গভীরতায় তাপমাত্রা এক ডিগ্রির বেশি বেড়ে গেছে। এরমধ্যে উচ্চতম এবং উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় উষ্ণতা বৃদ্ধির হার সর্বাধিক। ফলে ইউরোপের পার্বত্য অঞ্চলে পার্মাফ্রস্ট আগের তুলনায় অনেক বেশি এবং দ্রুতহারে গলছে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন সুইস বিজ্ঞানী জ্যানেট নেটসলি। যিনি ডাভোসে অবস্থিত ‘ইনস্টিটিউট ফর স্নো অ্যান্ড অ্যাভালাঞ্চ রিসার্চ (SLF)’-এর গবেষক। নেটসলী বলেন –“পার্বত্য অঞ্চলের পার্মাফ্রস্টের উষ্ণতা বৃদ্ধির ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রতিটি অঞ্চল, গভীরতা ও সময়পর্ব জুড়েই দেখা যাচ্ছে।”

পার্মাফ্রস্ট অঞ্চলের তাপমাত্রা জলবায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যপটের রূপান্তরেই নয়, বরং পার্বত্য অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণ ও ঢালের স্থায়িত্বের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই পার্মাফ্রস্টকে অনেকে ‘পর্বতের অদৃশ্য আঠা’ বলে থাকেন। কারণ এটি না থাকলে পাহাড়ের ঢাল গড়িয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। গ্রীষ্মকালে পার্মাফ্রস্টের উপরের যে স্তরটি গলে যায় তাকে “সক্রিয় স্তর” বলা হয়। এর নিচের অংশেই মূল পার্মাফ্রস্ট অবস্থিত। সুইস আল্পস-এ এই নিম্ন স্তরের পুরুত্ব দশ মিটার থেকে কয়েকশো মিটার পর্যন্ত হতে পারে। আর মেরু অঞ্চলে এর গভীরতা পৌঁছাতে পারে ১.৭ কিলোমিটার পর্যন্ত।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, ইউরোপের পার্বত্য অঞ্চলে পার্মাফ্রস্টের উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি আর্কটিক অঞ্চলের সঙ্গে প্রায় সমানতালে চলছে। সবচেয়ে বেশি উষ্ণতা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে উচ্চতম এবং উত্তরের অঞ্চলগুলিতে। একটি আকর্ষণীয় বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ বলছে –বরফসমৃদ্ধ পার্মাফ্রস্টের তাপমাত্রা যখন শূন্যের কাছে পৌঁছায়, তখন গলনের গতি ধীর হয়ে যায়। কারণ তাপগতি বিদ্যার নিয়ম মেনে ৩৩৬ হাজার জুল তাপশক্তি শোষণ করতে পারলে শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মাত্র এক কেজি বরফ জলে পরিণত হতে পারে। কিন্তু ভূউষ্ণায়নের কারণে একবার বরফ গলে গেলে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। কারণ, সাদা শুকনো বরফ সূর্যের তাপকে সহজেই বিকিরিত করে ফিরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু বরফগলা অস্বচ্ছ কালো জল তাপ অনেক বেশি করে শুষে নিয়ে হিমবাহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে বরফের গলন বাড়ে আরও বেশি করে।

গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান হারে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে এই গলনের ধারা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে এবং অবশ্যই তা বাড়বে। অধ্যাপক নেটসলি জানান –“আমরা দেখতে পাচ্ছি ১০ মিটার গভীরতায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বেশি এবং এর চেয়েও গভীর স্তরে অপেক্ষাকৃত কম। অর্থাৎ এই উষ্ণতা ভবিষ্যতে আরও গভীরে প্রবেশ করবে।” সুইজারল্যান্ডের পার্মাফ্রস্ট গলনের যেন কোন বিশ্রাম নেই। অবিরত শুধুই গলে যাওয়া।

সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতের সাম্প্রতিক ভয়াবহ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশের অদৃশ্য স্তরগুলোর প্রতিও আমাদের গভীর মনোযোগ দেওয়া জরুরি। পার্মাফ্রস্টের
গলন মানে শুধু বরফ গলে যাওয়া নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সংকেত। যে সংকেত আমাদের প্রতিমুহূর্তে জানান দিয়ে যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর কেবল ভবিষ্যতের ভয় নয়, এটি ভয়ঙ্কর ঘটমান বর্তমান। হিমবাহ ও পার্মাফ্রস্টের গলন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের একটি অদৃশ্য এবং গভীর প্রভাব। ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বরফ গলে যাওয়ার সাথে সাথে মুক্তি পাচ্ছে জমাটবাঁধা কার্বন, বরফের গভীর স্তরে হাজার লক্ষ বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা জীবন্ত ভয়ানক অণুজীবের দল জেগে উঠতে পারে যেকোন সময়। যার হাত ধরে অজানা, অচেনা জীবাণুঘটিত রোগ অসুখ বাড়ার আশঙ্কাও দেখা দিচ্ছে। তার সাথে বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি। সব মিলিয়ে একটি হিমবাহের মৃত্যু পর্বতমালার বাস্তুতন্ত্র, মানুষের জীবন যাপন ও নিরাপত্তার ওপর ভয়ানক হামলা।

একটি গ্রামের বিলুপ্তি শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করাটা কতটা জরুরি নিজেদের বেঁচে থাকার স্বার্থেই। নোটে গাছগুলো এইভাবেই শুকিয়ে যায়। কিন্তু কদর্য কলঙ্কিত কলুষিত এই গল্পগুলো চলতে থাকে। চলতেই থাকে …। গল্পকথার সর্পিল পথ বেয়ে যদি চলে যাই আমাদের সাধের হিমালয়ের উচ্চশিখরে, তাহলেও সেই ধ্বংস ও মৃত্যুর নিরন্তর গল্পই পাব শুনতে। যদি আমরা আজ সতর্ক না হই, কাল হয়তো শুধুই নীরব ধ্বংস দেখার পালা। তাই, এই নিবন্ধটি শুধু একটি মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবেদন নয়, এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক আহ্বান –আসুন প্রকৃতির গুরুত্বকে উপলব্ধি করি, তার সুরক্ষায় ধ্যান দিই। প্রকৃতির মেরামতিতে আসুন জোট বাঁধি।

The post আল্পস পর্বতমালায় ভয়াবহ হিমবাহ ধস একটি গ্রামকে নিশ্চিহ্ন করে দিল: শিখিয়ে দিয়ে গেল অনেক কিছু appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/alps-glacier-collapse-destroys-village-warning-on-climate/feed/ 0 3238
একুশ শতকের জ্বালানি : পুঁজির পৌষমাস, পৃথিবীর সর্বনাশ https://pariprashna.in/article/society/energy-in-the-21st-century-capitals-gain-the-doom-of-the-world/ https://pariprashna.in/article/society/energy-in-the-21st-century-capitals-gain-the-doom-of-the-world/#respond Wed, 30 Apr 2025 07:41:26 +0000 https://pariprashna.in/?p=3213 সত্তরের দশকে আমেরিকা ব্রেটন-উডস সিস্টেম থেকে বেরিয়ে এসে সৌদি আরবের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সঙ্গে ডলারকে জুড়ে দেয়। ওপেকভুক্ত দেশগুলোও মানতে বাধ্য হয় ‘নো ডলার নো ওয়েল’ নীতি। সাদ্দাম হুসেন ইউরোপে ইউরোতে তেল বিক্রির চেষ্টা করেছিল। এরপর ইরাকের মানুষের কী অবস্থা হয়েছিল, তা আমাদের সকলের জানা

The post একুশ শতকের জ্বালানি : পুঁজির পৌষমাস, পৃথিবীর সর্বনাশ appeared first on Pariprashna.

]]>
প্রীতিলতা বিশ্বাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ উপনিবেশের অবসান হয়। বিশ্বব্যাঙ্ক, আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার, জাতিসংঘ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের মাধ্যমে পৃথিবীতে একটি আপাত স্বাধীন সমতার বাতাবরণ তৈরি করা হয়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির আড়ালে থেকে কাজ করতে শুরু করে। সভ্যতার চাকা ঘোরার জন্য প্রধান প্রয়োজন ছিল জ্বালানি তেলের। তাই মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের উপর আধিপত্য কায়েম করা ছিল আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের প্রধান উদ্দেশ্য। প্রতিপক্ষ ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ রাশিয়ার রাজনৈতিক আধিপত্য, কারণ রাশিয়া নিজেও খনিজ তেলে সমৃদ্ধ। আধিপত্য কায়েম করার হাতিয়ার হিসাবে আমেরিকার সামরিক পোস্ট স্বরূপ দখলদার ইজরায়েল রাষ্ট্রকে তৈরি করা হয় প্যালেস্টাইনের জমিতে। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ কোনদিন থামেনি। একের পর এক উগ্রপন্থী সংগঠনের সংখ্যা বেড়েছে।

সত্তরের দশকে আমেরিকা ব্রেটন-উডস সিস্টেম থেকে বেরিয়ে এসে সৌদি আরবের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সঙ্গে ডলারকে জুড়ে দেয়। ওপেকভুক্ত দেশগুলোও মানতে বাধ্য হয় ‘নো ডলার নো ওয়েল’ নীতি। সাদ্দাম হুসেন ইউরোপে ইউরোতে তেল বিক্রির চেষ্টা করেছিল। এরপর ইরাকের মানুষের কী অবস্থা হয়েছিল, তা আমাদের সকলের জানা। ক্রুড ওয়েলের মতো হেরোইন সারা পৃথিবীতে ডলারে বিক্রি হয়। আর কিছুদিন আগে পর্যন্ত এর সর্বোচ্চ উৎপাদক ছিল আফগানিস্থান। আফগানিস্থানে আমেরিকার সৈন্য কতদিন ছিল সেটাও আমাদের জানা।

খনিজ তেলের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও অরণ্য নিধন প্রকৃতির গড় উষ্ণতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া মজুদ ভান্ডারের সীমাবদ্ধতা আছে। তাই আগামী দিনের জন্য বিকল্প শক্তির সন্ধান করতেই হবে, সেই সঙ্গে প্রয়োজন প্রযুক্তির উন্নতিসাধন। এই দুইয়ের জন্য প্রয়োজন বিরল খনিজ পদার্থ। মোট ১৭টি মৌল এই বিরল খনিজ গোত্রে পড়ে। চীনের কোন খনিজ তেলের মজুদ নেই। ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বিরোধকে কাজে লাগিয়ে চীন মুদ্রার লেনদেন ছাড়া বার্টার সিস্টেমে ইরানের তেলের প্রধান খরিদ্দার। ১৯৮৭ সালেই লি শিয়াও বলেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের আছে খনিজ তেল আর আমাদের আছে বিরল খনিজ। সত্যিই তাই। চীন পৃথিবীতে বিরল খনিজের মজুদ ভান্ডার এবং উৎপাদন সব দিক দিয়েই শীর্ষ স্থানে আছে। বিরল খনিজ নিষ্কাশনের জ্ঞান এবং প্রযুক্তি দুটিতেই সে এগিয়ে আছে।

বিরল খনিজের ব্যবহার

মহাকাশ গবেষণা থেক শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জাম এমনকি ফ্রিজের গায়ে লাগানো চুম্বকে এবং মোটরে পর্যন্ত বিরল খনিজের ব্যবহার হয়। ব্যাটারি চালিত যানবাহনের প্রধান উপাদান বিরল খনিজ। সোলার প্যানেল যা প্রকৃতি বান্ধব শক্তির উৎস হিসাবে পরিচিত, আমেরিকার সর্বাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য নয়শ পাউন্ডের উপর বিরল খনিজ প্রয়োজন, মোবাইল-টিভি-ল্যাপটপের স্ক্রীন, সুপার কম্পিউটার হিসাবে পরিচিত কোয়ান্টাম কম্পিউটারের জন্য বিরল খনিজ অত্যন্ত জরুরি। এমআরআই মেশিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম, এমনিকি মানবদেহে ট্যাটু আঁকার জন্যও প্রয়োজন হয় বিরল খনিজের। এরপরেও বাকি থাকল আরও অনেক কিছুর উল্লেখ।

বিরল খনিজের মজুদ

ব্যাবহারের তালিকা থেকে এটা পরিষ্কার যে আগামীদিনে বিরল খনিজের চাহিদা আরও বাড়বে এবং বিরল খনিজের দখলদারি নিয়ে আগামী বিশ্বের মাথাব্যথার শেষ থাকবে না। তাই দেখে নেওয়া প্রয়োজন, পৃথিবীর কোন্ দেশে বিরল খনিজের মজুদ কতটা। শীর্ষে থাকা চীনের মোট মজুদের পরিমান ৪ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন। ২০২২ সালের হিসাব অনুসারে বার্ষিক উৎপাদন ২ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। দ্বিতীয় স্থানে আছে ব্রাজিল, ২ কোটি ৭০ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৬ সাল থেকে বছরে ৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা। ৬৯ লাখ মেট্রিক টন মজুদ নিয়ে ভারত আছে তৃতীয় স্থানে। চতুর্থ স্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়া খুব একটা পিছিয়ে নেয়। তার মজুদের পরিমাণ ৫৭ লাখ মেট্রিক টন। যার মধ্যে ২০২৪ সালে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার মেট্রিক টন। রাশিয়া আর ভিয়েতনামের নিজেদের মজুদ ঘোষণা নিয়ে বেশ রহস্যময় আচরণ করে। রাশিয়া প্রথমে তার মজুদ ১ কোটি মেট্রিক টন বলে ঘোষণা করে। পরে বলে ওটা ভুল হয়েছে, আমাদের মজুদ ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। ভিয়েতনামে সরকারি দফতর থেকে ঘোষণা করা হয় তাদের মজুদ ২ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন। এরপরে সংশ্লিষ্ট অফিসারদের বরখাস্ত করে ঘোষণা করা হয় তাদের মজুদ মাত্র ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। পরে ওই অফিসাররা গ্রেফতারও হয়ে যান। তাহলে বোঝা যাচ্ছে বিরল খনিজের মজুদ নিয়ে এক ধরণের লুকোছাপার বিষয় আছে আন্তর্জাতিক মহলে। এবার আসি আমেরিকার প্রসঙ্গে। মজুদের দিক থেকে তার অবস্থান সপ্তম। ১৯ লাখ মেট্রিক টন। তবে আমেরিকা প্রতি বছর উৎপাদন করে ৪৫ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ নিষ্কাশনের জ্ঞান ও প্রযুক্তি দুটিই তার হাতে আছে।

বিরল খনিজের মজুদ ভান্ডার হিসাবে হিমালয়ের একটি স্বতন্ত্র ভূমিকা আছে। তিব্বত থেকে শুরু করে মাউন্ট এভারেস্ট পর্যন্ত প্রায় ১০০০ কিমি দীর্ঘ অঞ্চলে হালকা রঙের গ্রানাইট পাথরের নীচে রয়েছে নিওবিয়ম, ট্যানটেনাম, লিথিয়াম, যা গ্রীন এনার্জি-প্রযুক্তির জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয়। হিমালয়ের গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই তৈরি হয়েছে এই বিরল খনিজের মজুদ। ভারতীয় প্লেট আর ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের ঘর্ষণের ফলেই হিমালয়ের পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিভিন্ন বিরল খনিজের এক বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই দীর্ঘ হাজার কিমি জুড়ই রয়েছে ভারত ও চীনের সীমান্ত বিতর্ক। লাদাখে চীন অনেকটাই ভারতের দিকে এগিয়ে এসেছে, এবং ২০২০ সালের গালওয়ানের কথা নিশ্চয়ই আমরা ভুলিনি।

ইউরোপের অবস্থা

ইউরোপ বিরল খনিজের মজুদ ও তা নিষ্কাশনের জ্ঞান ও প্রযুক্তি সব দিক থেকেই পিছিয়ে আছে। রাশিয়াকে তারা কোনভাবেই ইউরোপের অংশ হিসাবে মনে করেনা। আবার ইউক্রেনের সম্ভাব্য মজুদ আমেরিকা কব্জা করতে চলেছে। গ্রীনল্যান্ডের বরফের নীচে অবশ্য ১৫ লাখ মেট্রিক টনের একটি মজুদ পাওয়া গেছে। ইউরোপের নর্ডিক দেশগুলির সঙ্গে গ্রীনল্যান্ডের ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ুর মিল আছে। সেই হিসাবে আশা করা যেতে পারে, ভবিষ্যতে ইউরোপেও বিরল খনিজের একটা মজুদ ভান্ডার তৈরি হতে পারে। ইতিমধ্যে ১০ লাখ মেট্রিক টনের সন্ধান পাওয়া গেছে সুইডেনে। তবে নিশ্চিতরূপেই ইউরোপ এখন পুরোপুরি আমদানি নির্ভর এবং ভবিষ্যতেও কিছুটা পিছিয়েই থাকার সম্ভাবনা।

নব্বই শতাংশের উপর চীন কর্তৃত্ব করবে আর সপ্তম অবস্থানে থেকে আমেরিকা যে আঙুল চুষবে না, সেটা তারা জেলেনেস্কিকে দিয়ে ধরে বেঁধে এবং নানান চাপ দিয়ে চুক্তি সই করিয়ে নেবার মরীয়া প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছে। তবে ইউক্রেনের সম্ভাব্য খনি অঞ্চলের অনেকটা রাশিয়া অধিকার করে নিয়েছে।

মিয়ানমার

আমরা সবাই জানি বর্তমানে মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত। মিয়ানমারে বিরল খনিজের কোন সরকারি ঘোষণা নেই। অথচ মিয়ানমার বিরল খনিজের উৎপাদনে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে আছে। রয়টার বলছে, মিয়ানমার চীনে বিরল খনিজ রপ্তানি করে বছরে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন। চীন নিজে উৎপাদনে শীর্ষ স্থানে থাকার পরও কেন মিয়ানমার থেকে আমদানি করে? সেকথায় পরে আসছি। মিয়ানমারে যে শুধু বিরল খনিজ পাওয়া যায় তা নয়, এখানে সোনা সহ আরও অনেক খনিজই পাওয়া যায়। মিয়ানমার এখন আফিম চাষ এবং হেরোইন উৎপাদনে পৃথিবীতে শীর্ষ স্থানে আছে। এখানে ২৫টি উগ্রপন্থী দল সক্রিয় অবস্থায় আছে। ৩০০টির বেশি খনি আছে মাত্র ৭০০-৮০০ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে। এই খনি অঞ্চল ও আফিম চাষের উপর কব্জা করে আছে এক একটি সশস্ত্র বাহিনী, যার কিছু সংখ্যক আছে সামরিক জুন্টা বাহিনীর ছাতার তলায়, কিছু আছে ইউএনএ বা ন্যাশানাল ইউনিটি গভার্নমেন্টের ছাতার তলায়। রাখাইন অঞ্চলে বিরল খনিজের ভারী আকারে মজুদ থাকার সম্ভাবনা আছে, যে রাখাইন অঞ্চল থেকে রোহিঙ্গাদের মেরে তাড়ানো হয়েছে। চীন, আমেরিকা তো বটেই, রাশিয়া ও ভারতও এখানে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত। সম্পদের আধিক্যই আজ মিয়ানমারের পরিবেশ ও মানুষের বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে।

ভারতের বিরল খনিজ

ভারত বিরল খনিজের মজুদের দিক থেকে পৃথিবীতে তৃতীয় স্থানে আছে। এই বিরল খনিজের মজুদ মূলতঃ রয়েছে উপকূল অঞ্চলে। কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো উপকূলীয় অঞ্চলে মোনাজাইট নামক ফসফেট খনিজ পাওয়া যায়। যা থোরিয়াম, ইউরেনিয়াম এবং পৃথিবীর বিরল উপাদান ধারন করে। জিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, জম্মুর রিয়াসি জেলায় সালাল-হাইমানা এলাকায় লিথিয়ামের মজুদ থাকতে পারে।

দৌড়ে এগিয়ে ব্রিক্স

২০০৯ সালে ব্রিক্স প্রথম গঠিত হয়। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা এর প্রাথমিক সদস্য হলেও মধ্যপ্রাচ্য এবং লাতিন আমেরিকা সহ অন্যান্য দেশও এর সদস্য হতে শুরু করেছে। প্রাথমিক সদস্যদের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার মজুদের বিষয়ে আগে বলা হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার মজুদ ৮ লক্ষ মেট্রিক টন। এবারে তাহলে সরল যোগের নিয়মেই বোঝা যাচ্ছে যে,  ব্রিক্স গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি পৃথিবীর মোট বিরল খনিজের ৯০ শতাংশের মালিক। আর সেখানে চীন রয়েছে শীর্ষ স্থানে। যেহেতু এই খনিজ নিষ্কাশন সংক্রান্ত জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে চীন সেই ৮০র দশক থেকে গবেষণা করছে। তাই এখানে টেক্কা দেবার মতো কেউ তার ধারে কাছে নেই। এই জ্ঞান সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও চীন ভীষণ সতর্ক। তাই বিরল খনিজ রপ্তানি সংক্রান্ত নানা বিষয়ে চাপানো আছে অনেক নিষেধাজ্ঞা।

আমেরিকার মাথাব্যথা সক্রিয়তা

নব্বই শতাংশের উপর চীন কর্তৃত্ব করবে আর সপ্তম অবস্থানে থেকে আমেরিকা যে আঙুল চুষবে না, সেটা তারা জেলেনেস্কিকে দিয়ে ধরে বেঁধে এবং নানান চাপ দিয়ে চুক্তি সই করিয়ে নেবার মরীয়া প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই বুঝিয়ে দিয়েছে। তবে ইউক্রেনের সম্ভাব্য খনি অঞ্চলের অনেকটা রাশিয়া অধিকার করে নিয়েছে। ইতিমধ্যেই আমেরিকা গ্রীনল্যান্ড কিনে নেবার কথা বলেছে এবং সেখানে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু করেছে। কানাডা, যার মজুদ ৮ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন, তাকে ট্রাম্প আমেরিকার সঙ্গে জুড়ে যাবার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়াও ২০০৭ সালেই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের প্রভাবকে আটকানোর জন্য আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে একটি জোট তৈরি করে। এটি মূলতঃ সামরিক জোট। লক্ষণীয় বিষয় হল বিরল খনিজের মজুদের নিরিখে বিশ্বে তৃতীয় ভারত ও চতুর্থ অস্ট্রেলিয়া এই জোটের অংশীদার। সেই হিসাবে আমেরিকা প্রকারন্তরে বিরল খনিজের একটি বড় অংশের উপরেই খবরদারি করার সুযোগ পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

বিরল খনিজ পরিবেশ

এই প্রসঙ্গটি বোঝার জন্য মিয়ানমারকেই বেছে নেওয়া ভালো। চীন একাই মিয়ানমার থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন আমদানি করে। চীন নিজে মজুদের শীর্ষে থাকার পরও কেন আমদানি করে? কারণ চীনের পরিবেশ। বিরল খনিজের মাইনিং সবই হচ্ছে ওপেন পিট মাইনিং। ওপেন পিট মাইনিংয়ের জন্য অঞ্চল বসতিশূণ্য করতে হবে। তারপরেও এর দূষণের প্রভাব পড়বে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্যের উপর। পাহাড় অঞ্চলে মাইনিং হলে ধ্বসের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। ভূগর্ভস্থ জলকে অম্লীয় (acidic)করার সম্ভাবনা থাকে। নিজের দেশের দূষণ থেকে মুক্তি পেতে চীন মিয়ানমার থেকে বিরল খনিজ আমদানি করে। এখন আমদানির হিসাবটা সরকারি এবং বৈধ। কিন্তু চীন-মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলে বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে উগ্রপন্থী দলগুলির অবৈধ খনিজ পাচারের লেনদেনও হয়। এই সুযোগটা নিতে পারে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের অস্থিরতাকে পুঁজি করে। কারণ উগ্রপন্থী দলগুলির অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য দেশের খনিজ বিক্রির অর্থই একমাত্র উৎস। চীন, রাশিয়া, আমেরিকা প্রত্যেকটি দেশ চাইবে নিজের নিজের দেশের পরিবেশকে বাঁচিয়ে বৈধ অবৈধ যেকোন ভাবেই হোক বিরল খনিজ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আমদানি করতে। সেক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশে শান্তির বাতাবরণটি নষ্ট করা বিশেষ প্রয়োজন। ভারতের উপকূল ও মিয়ানমারে যদি বিরল খনিজ থাকতে পারে তাহলে একই ভূমিরূপের বাংলাদেশে কেন নয়? সেই হিসাবে বাংলাদেশেও বিরল খনিজ থাকার সম্বাবনা আছে। যদিও সরকারি স্তরে কোনো ঘোষণা নেই। ভারতের ক্ষেত্রে যদি আমরা উপকূল অঞ্চলে থাকা বিরল খনিজ তুলতে যায়, তাহলে জল ও বায়ু দূষণের সঙ্গে সঙ্গে ভাবতে হবে বিপুল সংখ্যক মৎসজীবী মানুষের জীবন-জীবিকার কী হবে? এইখানেই হিমালয় জুড়ে যে বিরল খনিজের উপস্থিতি আছে সেই প্রসঙ্গ চলে আসবে। সীমান্ত নিয়ে বিতর্কের যদি রাজনৈতিক সমাধান হয়েও যায় তাহলেও কি হিমালয়ের খনিজ উত্তোলন ভারতের ভৌগলিক গঠনকে আদৌ অক্ষুন্ন রাখতে পারবে? আমরা বাস করি হিমালয়ের ঢালের দিকে, যার জন্য স্বাভাবিক ভাবে নদী প্রবাহ আমাদের উর্বর সমভূমি দান করেছে। কিন্তু ওই একই কারনে ভারতের দিকে হিমালয় ধ্বস প্রবণ। আর হিমালয় ও তার বনভূমি নষ্ট হয়ে গেলে ভারতের উত্তরাঞ্চল শীতল মরুভূমিতে পরিণত হবে। তাই এই হিমালয় প্রসঙ্গে ভারতের একই সঙ্গে ব্রিক্স ও কোয়াডের সদস্য থাকাটা খুবই স্ট্র্যাটিজিক।

আগামী পৃথিবীর জ্বালানি শক্তি হতে চলেছে বিরল-খনিজ। শুধু জ্বালানি নয়, সেই সঙ্গে প্রযুক্তিগত উন্নয়নেরও প্রাণভোমরা এই বিরল খনিজ। যা সম্ভাব্য ভারী মাত্রায় সঞ্চিত রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে। এই সঞ্চয় কি ভারতীয় উপমহাদেশের পরিবেশ ও মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনতে চলেছে? বিগত ৭৫ বছরে আমরা দেখেছি জ্বালানির মজুদ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য কখনও শান্ত থাকতে পারেনি। এখানেও সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের ছাত্র-যুব বিদ্রোহ ও তার পরবর্তী ঘটনা, পাকিস্তানের বালুচ উপজাতির বিদ্রোহীদের ট্রেন হাইজ্যাক, এবং ভারতের পহেলগাঁও হত্যাকান্ড—সবই পরস্পরকে দোষারোপ করে পরস্পরের বিরুদ্ধে আস্তিন গোটানোর অনুঘটক হিসাবে কাজ করছে। এবং দেশের জনগণ সব সমস্যা ভুলে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিভাজনকে স্থায়ী শত্রুতাররূপ দিতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠছে। মিয়ানমারের পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে দেশের সম্পদ লুটের জন্য আভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জন্য আদর্শ অবস্থা।

পরিশেষে

লড়াইটা শুধু পৃথিবীর মাটিতে থেমে নেয়। চীন ও রাশিয়া ২০২৭ এর মধ্যে যৌথ মহাকাশ স্টেশন তৈরির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। আমেরিকাও একটি সংস্থা খুলেছে যেখানে বিভিন্ন কোম্পানি এবং দেশ অংশগ্রহণ করতে পারবে। বৃহস্পতি ও মঙ্গল গ্রহের কাছে একটি গ্রহানুর সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে বিপুল পরিমান খনিজের সন্ধান মিলেছে। হয়তো দেখা যাবে কিছুদিনবাদে ভারতও এই দৌড়ে সামিল হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দায়িত্ব পুরোপুরি ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মহাকাশে বিরল খনিজের সন্ধানে গবেষণা চলবে। আর আমরা খেয়ে, না খেয়ে হিন্দু-মুসলমান তর্জা নিয়ে ব্যস্ত থাকব!

The post একুশ শতকের জ্বালানি : পুঁজির পৌষমাস, পৃথিবীর সর্বনাশ appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/society/energy-in-the-21st-century-capitals-gain-the-doom-of-the-world/feed/ 0 3213