বঙ্কিম  দত্ত Archives - Pariprashna https://pariprashna.in/tag/বঙ্কিম-দত্ত-2/ Sat, 20 Sep 2025 09:44:03 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=7.1.2 https://i0.wp.com/pariprashna.in/wp-content/uploads/2018/03/cropped-pariprashna-Logo-1-2.jpg?fit=32%2C32&ssl=1 বঙ্কিম  দত্ত Archives - Pariprashna https://pariprashna.in/tag/বঙ্কিম-দত্ত-2/ 32 32 182578982 ভারতীয় সংবিধান ও আর.এস.এস-এর সমস্যা https://pariprashna.in/article/society/the-problem-with-the-indian-constitution-and-the-rss/ https://pariprashna.in/article/society/the-problem-with-the-indian-constitution-and-the-rss/#respond Sat, 20 Sep 2025 09:44:00 +0000 https://pariprashna.in/?p=3284 ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে পরিচালিত হয়ে সংবিধান গঠন করেছে। তবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আর.এস.এস.) এর হিন্দু জাতীয়তাবাদ সংবিধানের মূল দর্শনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, সামাজিক ন্যায় ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এই দ্বন্দ্ব আজও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনা কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

The post ভারতীয় সংবিধান ও আর.এস.এস-এর সমস্যা appeared first on Pariprashna.

]]>
বঙ্কিম দত্ত

ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শে উদ্বুদ্ধ এক দীর্ঘ লড়াই। এই সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকেই গড়ে ওঠে ভারতের সংবিধান, যা ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে নাগরিকের সমান অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতি এবং সমাজকল্যাণমূলক লক্ষ্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ লিখিত সংবিধান এদেশের, যার প্রস্তাবনা, অংশ (Parts), অধ্যায় (Articles) ও সূচি (Schedules) মিলিয়ে বিস্তৃত কাঠামো। We, the People of India… দিয়ে শুরু, জনগণের সার্বভৌমক্ষমতা যার লক্ষ্য। লক্ষ্য ন্যায়–সাম্য–স্বাধীনতা–ভ্রাতৃত্ব । রাষ্ট্রের স্বরূপ: Sovereign, Socialist, Secular, Democratic, Republic. সমতার অধিকার (আর্ট. 14–18), স্বাধীনতার অধিকার (আর্ট. 19–22), শোষণের বিরুদ্ধে (23–24), ধর্মীয় স্বাধীনতা (25–28), সাংস্কৃতিক–শিক্ষাগত অধিকার (29–30), সংবিধানিক প্রতিকার (32)— এই মৌলিক অধিকারগুলো সংবিধানে রয়েছে যাকে আম্বেদকর “সংবিধানের আত্মা” বলেছেন। 

কিন্তু সংবিধানের এই দৃষ্টিভঙ্গি শুরু থেকেই অসুবিধায় ফেলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আর.এস.এস)-কে, কারণ তাদের মূল আদর্শ হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যাকে তারা “হিন্দু রাষ্ট্র” ধারণার মাধ্যমে প্রকাশ করে। ফলে ভারতীয় সংবিধান ও আর.এস.এস.-এর সম্পর্ক এক দীর্ঘ অস্বস্তি, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের ইতিহাস বহন করে।সংবিধান বিষয়ে  আর. এস. এস.-এর অস্বস্তির সবচেয়ে প্রকট দিকের একটি হলো তাদের মনুস্মৃতি-র প্রতি শ্রদ্ধা। আর. এস. এস.-এর মুখপত্র অর্গানাইজার (৩০ নভেম্বর, ১৯৪৯) এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিল যে, ভারতবর্ষের কাছে যখন প্রাচীন আইনগ্রন্থ হিসাবে মনুস্মৃতি বিদ্যমান, তখন সংবিধান প্রণেতারা কেন পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলির সংবিধান অনুকরণ করলেন?  এর সম্পূর্ণ বিপরীতে আম্বেদকর ১৯২৭ সালে প্রকাশ্যে মনুস্মৃতি দাহ করেন, কারণ তাঁর কাছে এটি জাতপাত নিপীড়নের প্রতীক। এই বৈপরীত্য কেবল মতাদর্শগত বিভেদ নয়, বরং সমতা-ভিত্তিক গণতন্ত্র এবং শ্রেণি-বিন্যস্ত ঐতিহ্যবাদ((hierarchical traditionalism)—এই দুই সভ্যতাগত শক্তির মধ্যে সংঘাতকে প্রতিফলিত করে। আর.এস.এস.-এর আদর্শে শ্রেণিবিন্যস্ত ঐতিহ্যবাদ প্রধানত তিনভাবে প্রকাশিত:

১. জাতিভিত্তিক বিভাজন ও মনুস্মৃতি-নির্ভর নৈতিকতা ২. হিন্দু সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রচার ৩. পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন। 

আর এস এস-এর অবস্থান হলো জাতিভিত্তিক শ্রেণি-ব্যবস্থার প্রতি আসক্তি। আর.এস.এস. “হিন্দু জাতি” ধারণাকে কেন্দ্রে রেখেছে, যা ভারতের বৈচিত্র্যময় জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষপূর্ণ। এই হিন্দুত্ববাদ মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আধিপত্যকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। এর ফলে মুসলমান, খ্রিস্টান, এবং দলিত-আদিবাসী সংস্কৃতি সবই প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এটি শ্রেণিবিন্যস্ত ঐতিহ্যবাদের সাংস্কৃতিক রূপ। আর.এস.এস.-এর ভাবনায় “গৃহিণী” এবং “জননী”- নারীর আদর্শ ভূমিকা।  নারীর স্বাধীনতা, সমানাধিকার বা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ অধিকারকে তারা পাশ্চাত্য প্রভাব বলে ছোট করে। তাদের এই লিঙ্গভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসে  সমাজে নারীর অধীনতা স্বাভাবিক হিসাবে গ্রাহ্য।

 ভারতীয় সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্য, বৈষম্যবিরোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শে গঠিত। আর.এস.এস.-এর চিন্তাধারায় এই আধুনিকতাকে বিরক্তিকর এবং তা  “প্রাচীন শাস্ত্রসম্মত সমাজ” ফেরত আনার স্বপ্ন লালন করে। এসবের অর্থ হলো সমতার গণতন্ত্র বনাম শ্রেণিবিন্যস্ত ঐতিহ্যবাদ—এই দ্বন্দ্ব আজও সক্রিয়।

সংবিধানের দর্শন বনাম আর.এস.এস-এর আদর্শ

সংবিধান প্রণেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টতই বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। বি.আর. আম্বেদকর, জওহরলাল নেহেরু, মৌলানা আজাদ, রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রমুখ নেতারা রাষ্ট্রকে একাধারে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং সমাজতান্ত্রিক চরিত্র দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আর.এস.এস., যার আদর্শ গ্রন্থ এম.এস. গোলওয়ালকরের “We, or Our Nationhood Defined” (১৯৩৯)-এ যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা মুসলমান ও খ্রিস্টানদের প্রতি তীব্র অবিশ্বাসে ভরা। গোলওয়ালকার মতে, ভারতবর্ষে “হিন্দু” ছাড়া অন্য কোনো জাতি রাষ্ট্রগঠনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকতে পারে না।

অতএব, সংবিধান যেখানে নাগরিকত্বকে ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করে, আর.এস.এস.-এর মতাদর্শ সেখানে একচেটিয়া হিন্দু জাতীয়তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রচর্চা করতে চায়।

আর.এস.এস. ও সংবিধান রচনায় বিরোধী অবস্থান

১৯৪৯ সালে যখন ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হয়, তখন থেকেই আর.এস.এস. তার সমালোচনায় সরব হয়। গোলওয়ালকর ও তার উত্তরসূরিরা দাবি করেন যে ভারতীয় সংবিধান “বিদেশি” (পশ্চিমি) ধারণা থেকে ধার করা, এতে ভারতীয় সংস্কৃতির মৌলিক চেতনা প্রতিফলিত হয়নি। তাদের মতে, প্রকৃত সংবিধান হওয়া উচিত ছিল মনুস্মৃতি-র উপর ভিত্তি করে।

আর.এস.এস.-এর প্রচারযন্ত্র (প্রচারক, শাখা শিক্ষা, পুস্তিকা) বারবার দাবি করেছে যে বর্তমান সংবিধান হিন্দু সমাজের ঐতিহ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। এই অবস্থান থেকেই তারা ধারাবাহিকভাবে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে “hatred campaign” চালায়।

‘Hatred Campaign’ এবং সংবিধান

আর.এস.এস.-এর কার্যকলাপ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তাদের ঘৃণার রাজনীতি মূলত দুটি দিকে কাজ করে:

১. সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো – মুসলমানদের ‘বিদেশি’, ‘অবিশ্বস্ত’ প্রমাণ করার চেষ্টা, খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে আন্তঃধর্মীয় বিবাহ নিয়ন্ত্রণের নামে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ, মব লিঞ্চিং ও গোরক্ষা রাজনীতি ও খিষ্ট্রান ধর্মপ্রচারকদের উপর আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। 

২. সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র আক্রমণ করা – সংবিধান যে সকল ধর্মকে সমান মর্যাদা দিয়েছে, সেটিকে “অতিরিক্ত তোষণনীতি” বলে তুলে ধরা। আরএসএস প্রচার করে যে এই বিশেষাধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের “অধিকার হ্রাস করছে”।

ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে প্রচারকার্যে  “Secular” শব্দটিকে আরএসএস “অপশব্দ” হিসেবে চিত্রিত করে, এবং দাবি করে যে এটি “পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র।”

বাবরি মসজিদ ভাঙা থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC) পর্যন্ত আর.এস.এস. ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে তারা সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ও নাগরিক সমতার ধারণার সঙ্গে বিরোধে রয়েছে।

সমাজতান্ত্রিক ধারনার সঙ্গে আর.এস.এস.-এর বিরোধ

সংবিধানের প্রস্তাবনায় ১৯৭৬ সালে ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ যুক্ত করা হয়, যা রাষ্ট্রকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের পথে চালিত করার প্রতিশ্রুতি বহন করে। সমাজতান্ত্রিক দর্শন রাষ্ট্রের দায়িত্বকে কেন্দ্র করে জনকল্যাণ, সমবণ্টন, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার রক্ষা এবং ধনতান্ত্রিক বৈষম্য হ্রাসের দিকে দৃষ্টি দেয়।আলাদাভাবে উল্লেখিত হওয়ার(১৯৭৬) আগে থেকেই ভারতীয় সংবিধান (১৯৫০) গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতান্ত্রিক ন্যায়বিচার ও প্রজাতন্ত্রের মূলনীতিকে ধারণ করে। 

কিন্তু আর.এস.এস.-এর দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তারা একদিকে রাষ্ট্রকে বাজারমুখী অর্থনীতির পক্ষে উন্মুক্ত করতে চায় (বিশেষত ১৯৯০-এর পর থেকে), অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক নীতি যেমন জমি সংস্কার, শ্রমিক সংগঠন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ইত্যাদির বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, সমাজতন্ত্র “পাশ্চাত্য” ধারণা এবং ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানান।

এছাড়া, সমাজতান্ত্রিক দর্শন যখন বর্ণব্যবস্থাকে প্রশ্ন করে এবং শ্রেণি-সমতার দাবি তোলে, তখন আর.এস.এস. তার ঐতিহ্যবাদী অবস্থান থেকে স্পষ্টতই অস্বস্তিতে পড়ে। মনুস্মৃতি-র মতো শাস্ত্রে যেভাবে বর্ণভিত্তিক কর্তব্য নির্ধারিত হয়েছে, আর.এস.এস. তার সাংস্কৃতিক পরিসরে সেই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে চায়। ফলে সমতা-ভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভাবনার সঙ্গে তাদের মতাদর্শগত সংঘাত অবশ্যম্ভাবী।

উপসংহার

ভারতীয় সংবিধান কেবল একটি আইনপত্র নয়, এটি হলো স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। এর মূল চেতনা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক ন্যায়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আর.এস.এস. এই দর্শনের সঙ্গে মৌলিকভাবে বিরোধী অবস্থানে রয়েছে, কারণ তাদের লক্ষ্য হলো একটি সাংস্কৃতিকভাবে সমজাতীয় হিন্দু রাষ্ট্র গঠন।

তাদের hatred campaign কেবল সংখ্যালঘুদের প্রতি নয়, সংবিধানের মূল দর্শনের প্রতিও। বিশেষত সমাজতান্ত্রিক ন্যায়ের ধারণা, যা শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন বহন করে, তা আর.এস.এস.-এর ঐতিহ্যবাদী, বর্ণনির্ভর এবং বাজারপন্থী আদর্শের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে আসে।

বিজেপি ও তার আদর্শগত ভিত্তি আর.এস.এস একদিকে রাষ্ট্রকে ‘হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ’-এর কাঠামোয় ঢেলে সাজাতে চাইছে, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে ধীরে ধীরে দুর্বল করছে।

অতএব বলা যায়, ভারতীয় সংবিধানের ইতিহাস যতদিন থাকবে, ততদিন আর.এস.এস.-এর অস্বস্তি ও বিরোধও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার কেন্দ্রে থেকে যাবে।

পুনশ্চ : বিশ্ব-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আরএসএস-বিজেপি প্রাসঙ্গিক থাকার প্রয়োজনে উভয়ের হিন্দুত্ববাাদী অবস্থান পারস্পরিক দোষারোপে জড়িয়ে যাচ্ছে এই লক্ষণ মাঝে মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: আরএসএস বনাম সংবিধান

The post ভারতীয় সংবিধান ও আর.এস.এস-এর সমস্যা appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/society/the-problem-with-the-indian-constitution-and-the-rss/feed/ 0 3284
পরিবেশবিদ্যাই স্থায়ী অর্থনীতি https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/ecology-is-a-sustainable-economy/ https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/ecology-is-a-sustainable-economy/#comments Tue, 01 Jul 2025 05:39:21 +0000 https://pariprashna.in/?p=3260 প্রকৃতির জটিলতা বোঝা বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই সাধনায় মানুষ পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মডেলিংয়ের মাধ্যমে অসাধারণ প্রচেষ্টা চালিয়েছে, কারণ এই বোঝাপড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং টেকসই অনুশীলনের জন্য তথ্য প্রদানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

The post পরিবেশবিদ্যাই স্থায়ী অর্থনীতি appeared first on Pariprashna.

]]>
পি. রাঘবন

পরিবেশবিদ সুন্দরলাল বহুগুণার জনপ্রিয় করা “পরিবেশবিদ্যাই স্থায়ী অর্থনীতি” এই বাক্যটি একটি স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি একটি মৌলিক সত্যের গভীর স্মরণিকা যে মানুষের সমৃদ্ধি পরিবেশগত স্বাস্থ্যের সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িত। এটি সত্য যে প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সেগুলো সংরক্ষণ ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অসম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের দ্রুত ক্ষতির মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে যে আমরা কি সত্যিই এই ধারণাটি বুঝেছি এবং গ্রহণ করেছি।

সঠিক ভারসাম্য অর্জন

প্রকৃতির জটিলতা বোঝা বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই সাধনায় মানুষ পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মডেলিংয়ের মাধ্যমে অসাধারণ প্রচেষ্টা চালিয়েছে, কারণ এই বোঝাপড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মতো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং টেকসই অনুশীলনের জন্য তথ্য প্রদানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এই বৈজ্ঞানিক আলোচনাগুলো মূল্যবান, তবে আমাদের আরও জরুরি এবং মৌলিক একটি সত্যের উপর মনোযোগ দিতে হবে: পরিবেশবিদ্যাই হলো প্রকৃত অর্থনীতি — আমাদের বেঁচে থাকা, নিরাপত্তা এবং অগ্রগতি এর উপর নির্ভর করে। সহজ কথায়, এটাই হতে পারে টেকসই তার সবচেয়ে স্পষ্ট সংজ্ঞা — পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়তার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে বের করা। এই ভারসাম্য ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশ বা অর্থনীতি কোনোটিই সমৃদ্ধ হতে পারে না।

প্রাণীজগতের অংশ হওয়া সত্ত্বেও, সভ্যতার পথে মানুষের বিবর্তন প্রকৃতির সাথে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে গেছে। প্রকৃতির সাথে এই বিচ্ছিন্নতাকে চলমান জীববৈচিত্র্য ক্ষতির একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (সাম্প্রতিক আন্তঃসরকারি বিজ্ঞান-নীতি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভার্সিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস বা আইপিবিইএস ট্রান্সফরমেটিভ চেঞ্জ রিপোর্ট)।

মানুষের ইতিহাসের প্রাথমিক পর্যায়ে, যাযাবর জীবনযাত্রা ব্যক্তিদের তাদের মৌলিক, দৈনন্দিন বেঁচে থাকার প্রয়োজনের জন্য শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করতে এবং তা ব্যবহার করতে বাধ্য করেছিল। সময়ের সাথে সাথে এই ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সম্পদ ব্যবহার ক্রমবর্ধমান সম্প্রদায়ের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে সমষ্টির ভোগে পরিণত হয়েছে। মানব সমাজ যখন সম্প্রসারিত হয়ে জাতি হিসেবে সংগঠিত হয়েছে, তখন এই চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেয়ে সমগ্র দেশের প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিস্তৃত হয়েছে। অবশেষে এই অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে জাতিসমূহ শুধুমাত্র বর্তমান চাহিদা মেটানোর জন্যই নয়, বরং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য সম্পদ নিরাপত্তার জন্যও প্রকৃতিকে শোষণ করতে শুরু করেছে। মানুষের বিপরীতে, প্রাণীজগতের অন্য কোনো প্রজাতি প্রাকৃতিক সম্পদের এই ধরনের বৃহৎ আকারের, প্রত্যাশিত শোষণের নমুনা প্রদর্শন করে না। অন্যান্য প্রাণী তাদের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাস করে, তাৎক্ষণিক বেঁচে থাকার জন্য যা প্রয়োজন শুধু তাই গ্রহণ করে, তারা যে বাস্তুতন্ত্রে বাস করে তার দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য বিঘ্নিত না করে।

নতুন জটিলতা 

মানুষের ক্রমবর্ধমান ভোগবাদ ও বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার চক্র পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের উপর অপ্রতিদ্বন্দ্বী চাপ সৃষ্টি করেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করেছে—এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা এখন মানব সৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে বিপজ্জনকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতিক্রিয়ায়, প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানকে সারাবিশ্বে সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় ব্যাপকভাবে সমর্থন করা হয়েছে। এই পদ্ধতিগুলির লক্ষ্য হলো বাস্তুতন্ত্রের সহজাত সহনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে জলবায়ুর প্রভাব প্রশমিত করা, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করা এবং টেকসই উন্নয়নকে সমর্থন করা। তবে এখানে একটি বৈপরীত্য দেখা দেয়: আমরা আমাদের প্রয়োজেন ও লালসা মেটাতে প্রকৃতির শোষণ চালিয়ে যাচ্ছি, আবার একই সময়ে এই শোষণের ফলাফল থেকে রক্ষা পেতে একই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করছি। এই দ্বৈত নির্ভরতাবাস্তুতন্ত্রের আরও গভীর ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ায় এবং জলবায়ুসংকট মোকাবিলার সামর্থ্যকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। 

এই প্রেক্ষাপটে, বাস্তুতন্ত্রের জটিলতাকে কেবল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার চেষ্টা করার বদলে একটি মৌলিক সত্যকে স্বীকার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ–বাস্তুতন্ত্রই হলো স্থায়ী অর্থনীতি। এই নীতিকে স্বীকার করে নিলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্পমেয়াদি শোষণ থেকে দীর্ঘমেয়াদি তত্ত্বাবধানের দিকে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে বাস্তুতান্ত্রিক সুস্থতাকে একটি বাধা হিসেবে নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। 

এই উপলব্ধি কেবল সময়োপযোগী নয়—এটি চলমান পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা ও একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য অপরিহার্য। কেবল এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমেই মানবতা প্রতিক্রিয়াশীল সংরক্ষণ থেকে সক্রিয় গ্রহ-স্তরের টেকসইযোগ্য ব্যবস্থায় এগিয়ে দিতে পারে। জলবায়ুসংকট কেবল একটি বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ নয়। এটি আমাদের অস্তিত্বের বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তির সাথে একটি নৈতিক ও অস্তিত্বগত হিসাব-নিকাশ।

প্রকৃতির সাথে পুনর্সংযোগের প্রয়োজন 

জলবায়ু পরিবর্তন ও জীব বৈচিত্র্যের বণ্টন প্যাটার্নের পরিবর্তন পৃথিবীর জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু, অতীতে মানুষের অস্বাস্থ্যকর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এটি এখন যে হারে ঘটছে, তা গ্রহের জীববৈচিত্র্য—যার মধ্যে মানুষও অন্তর্ভুক্ত—এর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই, আমাদের যে পরিবর্তন দরকার, তা আসতে হবে ভেতর থেকে। 

যেহেতু বিশ্বজুড়ে সব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, তাই টেকসই জীবনযাপন পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব—যাতে বিশ্ব জুড়ে গড়ে ওঠা টেকসইমুখীন উদ্যোগ সফল হয়। এটি অর্জনের জন্য আমাদের বুঝতে হবে যে, মানুষ প্রকৃতিরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আধুনিক জীবনযাত্রাকে প্রকৃতি থেকে দূরে ঠেলে দিলেও, মানুষের একটি অনন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হলো—আমরা এখনও আবেগের মাধ্যমে প্রকৃতির সাথে পুনঃসংযোগ স্থাপন করতে পারি (এই ক্ষমতা এখনও আমাদের মধ্যে বেঁচে আছে)। তাই, ভবিষ্যতের সংরক্ষণ প্রচেষ্টা এমনভাবে তৈরি করা উচিত যাতে প্রকৃতির সাথে আমাদের আবেগগত বন্ধন শক্তিশালী হয়। এটি জাগ্রত করতে, “বাস্তুতন্ত্রই স্থায়ী অর্থনীতি”—এই উপলব্ধি প্রকৃতির জটিলতা বোঝার চেয়েও বেশি জরুরি। 

ভাষান্তর:  বঙ্কিমদত্ত

লেখক পি. রাঘবন একজন বিজ্ঞানী যাঁর গবেষণায় আগ্রহের অন্যতম বিষয় বাস্তুতন্ত্র ও বায়ো-জিওকেমিস্ট্রি। তিনি ভারতের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র (ব্লু-কার্বন হ্যাবিট্যাট)-এ ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ ও কার্বন ডাইনামিক্সনিয়ে কাজ করছেন।

সৌজন্যে: দ্য হিন্দু

আগের লেখা: মধ্যপ্রাচ্যেই কি হবে আমেরিকা- সাম্রাজ্যবাদের কবর?

The post পরিবেশবিদ্যাই স্থায়ী অর্থনীতি appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/article/nature-and-environment/ecology-is-a-sustainable-economy/feed/ 1 3260
ধাতৃগৃহ থেকে কবরস্থান—ভারত ও পাকিস্তানে ঘৃণার চাষ https://pariprashna.in/uncategorized/from-the-maternity-ward-to-the-graveyardthe-cultivation-of-hatred-in-india-and-pakistan/ https://pariprashna.in/uncategorized/from-the-maternity-ward-to-the-graveyardthe-cultivation-of-hatred-in-india-and-pakistan/#respond Thu, 15 May 2025 18:13:14 +0000 https://pariprashna.in/?p=3223 এই ঘৃণা হঠাৎ তৈরী  হয়েছে  এমনটা  নয় । এটা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে রয়েছে। দেশভাগের সময়কার আতঙ্ক, অসমাধিত নানা বিরোধ, প্রতিশোধমূলক হিংসাত্মক ঘটনা—এমন অনেক কিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে শত্রুতার এই বন্ধুর  প্রান্তর।

The post ধাতৃগৃহ থেকে কবরস্থান—ভারত ও পাকিস্তানে ঘৃণার চাষ appeared first on Pariprashna.

]]>
ভারত ও পাকিস্তানে শিশুদের দানব বা শয়তানকে ভয় পাওয়া শেখানো হয় না, শেখানো হয় নিজের প্রতিবেশীকে ভয় পেতে। ‘শত্রু’ বলা হয় তাকে। ইতিহাসের এমন সব বর্ণনার ভিত্তিতে একটি কল্পিত ছবি গড়ে তোলা হয়, যা তারা কখনও নিজেরা অনুভব করেনি, যেসব ঘৃণার তারা কোনোদিন অংশ ছিল না। ভারত ও পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মননে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এক ধরনের সামাজিক পাঠক্রম—যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ‘আমরা বনাম ওরা’র যুদ্ধের মঞ্চ। এ যুদ্ধ ট্যাঙ্ক বা পারমাণবিক অস্ত্রের নয়, বরং অনেক বেশি নিষ্ঠুর—এটি মানুষের মনের গভীরে শিকড় ছড়ানো ঘৃণার যুদ্ধ। দু’ভাইয়ের মতো জাতির নাগরিকরা ধর্মের উন্মাদনায় বিভোর ও বিবাদমান।

এই ঘৃণা হঠাৎ তৈরী  হয়েছে  এমনটা  নয় । এটা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে রয়েছে। দেশভাগের সময়কার আতঙ্ক, অসমাধিত নানা বিরোধ, প্রতিশোধমূলক হিংসাত্মক ঘটনা—এমন অনেক কিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে শত্রুতার এই বন্ধুর  প্রান্তর। আজকের ডিজিটাল যুগে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধুই যোগাযোগের জায়গা নয়—এটা হয়ে উঠছে জাতীয়তাবাদের প্রতিধ্বনি কক্ষ, একধরনের চমৎকার মানসিকপ্রভাব বিস্তারকারী অস্ত্র। এই  মাধ্যমের দূরত্ব এবং গোপনীয়তা, ঘৃণা ছড়ানোর জন্য আদর্শ জমি তৈরি করে দিয়েছে। এখন ঘৃণা পোস্ট করা যায়, লাইক করা যায়, শেয়ার করা যায়।

এই সাইবার জাতীয়তাবাদ  দীর্ঘায়ু  সন্ত্রাসবাদের চেয়েও বিপজ্জনক। এসব অনলাইন যোদ্ধারা বন্দুক বহন করে না, তারা বহন করে এমনসব বর্ণনা যা জাতীয়তাবাদের উত্তেজনা ছড়ায় এবং বিপরীত পক্ষের জন্য ঘৃণার চাষ করে। যখন ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করে, বলে যে এটা পাহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের (যেখানে ২৬ জন পর্যটক নিহত হন) প্রতিশোধে পরিচালিত সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী অভিযান,  যদিও পাকিস্তান একে যুদ্ধ ঘোষণা বলে আখ্যা দেয় এবং দাবি করে যে এতে বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।

কিন্তু কূটনীতিকরা কথা বলার আগেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় ইনস্টাগ্রাম, টুইটার,  এবং হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদিতে ( কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াসহ—অনুবাদক। Accountability of the media in sensitive times। পাকিস্তানপন্থী বলে দাবি করা অ্যাকাউন্টগুলো পুরনো ও সম্পর্কহীন ভিডিওকে অপারেশন সিঁদুরের ফলাফল বলে শেয়ার করে ।  অপরদিকে, ভারতীয় অ্যাকাউন্টগুলো দেশপ্রেমের স্লোগান ‘জয় হিন্দ’ ছড়িয়ে দেয়, যার সাথে থাকে পাকিস্তান ও পাকিস্তানিদের প্রতি বিষাক্ত গালিগালাজ। ধর্মভিত্তিক অশ্রাব্য কুটুক্তি দেশপ্রেমকে রূপান্তর করে উগ্রজাতীয়তাবাদে।  আরও ভয়াবহ উদাহরণ হলো— যখন একজন ভারতীয় অলিম্পিক খেলোয়াড়  কেবলমাত্র এক পাকিস্তানির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখার কারণে অবর্ণনীয় গালিগালাজের শিকার হন।

পাহেলগাঁওয়ে যা ঘটেছে তা মানবতাবিরোধী, নৃশংস এবং কঠোরভাবে নিন্দনীয়। এই ঘটনার বিচার হওয়া উচিত শান্তির মাধ্যমে। কিন্তু যেটা আজকের মিডিয়ার জগতে ঘটছে তা আরও বিষাক্ত এবং অমানবিক। এটা শুধু সরকারের নীতির ফল নয়, বরং ছোটবেলা থেকেই সমাজে ঢুকিয়ে দেওয়া মতাদর্শগত শিক্ষা। অনেকে সত্যিই বিশ্বাস করেন যে ‘অন্যকে ঘৃণা করাই দেশপ্রেম’—যে ভারতীয় বা পাকিস্তানিকে গালি দেওয়াই নাকি জাতীয় কর্তব্য। কিন্তু এটা দেশপ্রেম নয়। এটা আদর্শিক সন্ত্রাসবাদ—যা শারীরিক সন্ত্রাসের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক, কারণ এটা নৈতিকতার মুখোশ পরে থাকে।

কমপক্ষে একজন সন্ত্রাসবাদী জানে সে কীসের জন্য লড়ছে, কিন্তু এসব সোশ্যাল মিডিয়া যোদ্ধারা লড়ে শুধুই এক শূন্যতা থেকে—যেটা তৈরি হয় ভয়, ভুল তথ্য এবং সমাজের শেখানো বিভাজনমূলক মানসিকতার মাধ্যমে। এই শূন্যতা তৈরি হয় শৈশব থেকে—যখন ভালোবাসার শিক্ষা নয়, বরং ভয়কে ভালোবাসতে শেখানো হয়। ভালোবাসার মানে যদি ঘৃণা হয়, তাহলে তা আর ভালোবাসা নয়। যদি ভালোবাসার জন্য শত্রু দরকার হয়, তাহলে তা আসলে নিরাপত্তাহীনতা।

১৯৪৭ সাল থেকে ইতিহাস শেখাতে গিয়ে আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো করুণা শেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় পরিচয় গড়ার তাড়ায় তারা মানবতার সাধারণ নীতিগুলো ভুলে গেছে। শিশুদের বড় হওয়ার সাথে সাথে মিডিয়া এই পক্ষপাত আরও গভীর করে তোলে। সত্য ও প্রচারের মাঝে পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়, সুশৃঙ্খল সমালোচনামূলক চিন্তার  জায়গা দখল করে  গল্পকথার ঝাঁক । সত্য তখন ঐচ্ছিক হয়ে যায়, বিচার হয়ে ওঠে আনুগত্যের বিষয়।

যখন জীবন ধ্বংস হয় এবং পরিচয় অস্ত্রে পরিণত হয়—তখন আইন কোথায়? আন্তর্জাতিক আইন এই ঘৃণার সামনে অসহায়। ‘আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ’ -এর অনুচ্ছেদ ২০(২) বলে — কোনো জাতীয়, জাতিগত বা ধর্মীয় ঘৃণা ছড়ানোর মতো কাজ যা বৈষম্য, শত্রুতা বা হিংসা উসকে দেয়—তা আইনত নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু এই আইনের সম্মান হয় শুধুই লঙ্ঘনের মাধ্যমে।

‘গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি প্রদান’ সংক্রান্ত কনভেনশনের অনুচ্ছেদ II(২) বলছে—“মানসিক ক্ষতি” গণহত্যার অন্তর্ভুক্ত। তাহলে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো জাতীয়তাবাদী সন্ত্রাসীদের কে দায়ী করবে তাদের মানসিক গণহত্যার জন্য?এসবের সংস্কার কি বাধ্যতামূলক নয়? একটা ভালো বিশ্বের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবায়ন কি বাধ্যতামূলক নয়? আন্তর্জাতিক আইন স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর কি দায়িত্ব নয় তা প্রয়োগ করা?

সমস্যা আইনের অভাব নয় বরং সদিচ্ছার অভাব, সমস্যা সমানুভূতিকে হৃদয়ে  পোষ মানিয়ে রাখার মধ্যে। হোক না সেটা ডিজিটাল—হিংসা, হিংসাই। আন্তর্জাতিক আইন কি আরও এগিয়ে এসে “ডিজিটাল হিংসা”কে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না?

বিশ্বের প্রয়োজন মোটেই একরকম হওয়া  উচিত  নয়, বরং প্রয়োজন একটা সর্বজনীন মানবতা। আরও কঠোর  সীমান্তই  সমাধান  নয়, বরং প্রয়োজন এমন মন তৈরী  করা যা নমনীয়—যা অন্য দেশের নাগরিককে গালি না দিয়ে বরং এতটুকু মানবতা দেখাতে পারে যে নিরপেক্ষ এক তদন্তকারী সংস্থা গঠিত হোক, যারা জাতীয় সার্বভৌমত্বের ঊর্ধ্বে উঠে মিডিয়াতে প্রচারিত বর্ণনার সত্যতা যাচাই করবে। শুধু পাহেলগাঁও নয়, শুধু অপারেশন সিঁদুর নয়—যে কোনো সংঘাতে যেখানে তথ্য অস্ত্রে পরিণত হয়।

মানচিত্র হতে পারে রাজনৈতিক, কিন্তু যন্ত্রণা  সর্বজনীন। তাই বিচারও হতে হবে সর্বজনীন।

 মূল লেখা : এম অশ্বিন রোম (বিশিষ্ট আইনজ্ঞ)

সূত্র : countercurrent. org

ভাষান্তর : বঙ্কিম  দত্ত

The post ধাতৃগৃহ থেকে কবরস্থান—ভারত ও পাকিস্তানে ঘৃণার চাষ appeared first on Pariprashna.

]]>
https://pariprashna.in/uncategorized/from-the-maternity-ward-to-the-graveyardthe-cultivation-of-hatred-in-india-and-pakistan/feed/ 0 3223